লেক কোমোর ধারে পুরোনো ভিলায় ফিরেছে আদি জৌলুশ

ইতালির লেক কোমোর নীল জল, চারপাশের পাহাড় আর পুরোনো স্থাপত্যের টানে প্রতিবছরই ছুটে আসেন ভ্রমণপিপাসুরা। এই মনোরম পরিবেশের মাঝেই ছোট্ট শহর ত্রেমেজ্জোয় রয়েছে উনিশ শতকের শেষভাগে নির্মিত এক নব্য-ধ্রুপদি ভিলা—ভিলা আন্না। সুইডিশ দম্পতি আসে বোথা ও গুস্তাফ ব্রুসেউইৎজের হাত ধরে বাড়িটি ফিরে পেয়েছে তার হারানো সৌন্দর্য।

প্রায় ২০ বছর আগে ব্রাসেলসে পরিচয়ের পর থেকে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কাজের সূত্রে লন্ডন, সিডনি ও স্টকহোমে বসবাস করেছেন এই দম্পতি। মহামারির সময় সুইডেনে ফিরে থিতু হলেও তাঁদের মনে হচ্ছিল, দৈনন্দিন ব্যস্ততা থেকে দূরে সময় কাটানোর জন্য একটি নিরিবিলি আশ্রয় প্রয়োজন। সেই খোঁজেই লেক কোমোর তীরে এই বাড়ির সন্ধান পান তাঁরা।

প্রায় ১,৫০০ বর্গফুটের অ্যাপার্টমেন্টটি সংস্কার করতে গিয়ে বেরিয়ে আসে একের পর এক বিস্ময়। নিচু করে ফেলা ছাদের আড়ালে পাওয়া যায় ফুলেল নকশার ফ্রেস্কো, ভিনাইলের নিচে লুকিয়ে থাকা পুরোনো টেরাজো মেঝে আর বেসমেন্টে রাখা ভারী কাঠের দরজা। বসার ঘর থেকে সরাসরি যাওয়া যায় প্রায় ৪,০০০ বর্গফুটের ব্যক্তিগত বাগানে। বাগানে নতুন করে গাছ লাগানোর পাশাপাশি বাড়ির পুরোনো অলংকরণও ফিরিয়ে আনা হয়।

বাড়ির ভেতরের সাজসজ্জায় এসেছে কোমো অঞ্চলের প্রকৃতি ও ঐতিহ্যের ছাপ। দেয়ালে পেস্তা-সবুজ, কার্নেশন ফুলের গোলাপি ও মাখন-হলুদের মতো কোমল রং ব্যবহার করা হয়েছে। ঘরে ঘরে রয়েছে পুরোনো সিরামিকের জগ, ক্রোশে-কাজের বিছানার চাদর এবং পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া আসবাব। পিয়েডমন্ট অঞ্চলের পুরোনো জিনিসপত্রের বাজার থেকেও সংগ্রহ করা হয়েছে কাঠের টেবিল, চেয়ার ও আয়নাযুক্ত আলমারি। নতুন কেনা হয়েছে কেবল বিছানা ও সোফা।

মিলানে বসবাসরত সুইডিশ স্থপতি লিনা হুরিংয়ের সহায়তায় বাড়ির অভ্যন্তরীণ বিন্যাসেও পরিবর্তন আনা হয়। দুটি শয়নকক্ষে রাখা হয়েছে মাচার ওপর ঘুমানোর ব্যবস্থা। নতুন বাথরুম ও আধুনিক রান্নাঘর যুক্ত হলেও পুরোনো স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা ছিল পুরো সংস্কারকাজে।

ভিলা আন্নার ইতিহাসও কম আকর্ষণীয় নয়। বর্তমানে ১০টি আবাসিক ইউনিটে বিভক্ত ভবনটির পাশেই রয়েছে নব্য-বারোক শৈলীর পাথরের ঝরনা ও খোলা সিঁড়ি। ইতালীয় স্থপতি পিয়েত্রো লিঙ্গেরির নকশা করা এই স্থাপনাগুলোর পেছনে ছিলেন সুইস বণিক রবার্তো মেইয়ার, যিনি ১৯১৮ সালে লেকের ধারের জমিটি কিনেছিলেন। পরবর্তী সময়ে সম্পত্তি ভাগ হয়ে একাধিক মালিকের হাতে যায়। সেই ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে ব্রুসেউইৎজ জানতে পারেন, বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ভবনটির নাম রাখা হয়েছিল ভিলা আন্না।

বাড়িটির ইতিহাস ও হারিয়ে যাওয়া স্থাপত্যের খুঁটিনাটি খুঁজে বের করাই বোথার কাছে সংস্কারকাজের সবচেয়ে আনন্দের দিক। তাঁর কাছে সুন্দর বাড়ি মানে এমন একটি পরিসর, যেখানে থাকতে ভালো লাগে এবং যার প্রতিটি কোণে লুকিয়ে থাকে অতীতের গল্প।

সুইডেন থেকে গাড়ি চালিয়ে ইতালি যাওয়া, পথে আল্পসে স্কি করা কিংবা সন্তানদের নিয়ে বিভিন্ন শহর ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতা তাঁদের এই বাড়িকে ঘিরে স্মৃতির ভান্ডারও সমৃদ্ধ করেছে। লেকের পাড়ে ছুটি কাটাতে গেলে ভিলা আন্নার মতো ঐতিহাসিক স্থাপনা মনে করিয়ে দেয়, পুরোনো বাড়ির দেয়াল, মেঝে ও আসবাবের ভেতরেও একটি অঞ্চলের জীবনযাত্রা ও ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায়।