ভারতের প্রাকৃতিক ভূপ্রকৃতি ও প্রাচীন ইতিহাসের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান যুক্ত হয়েছে ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের সম্ভাব্য তালিকায়। এর মধ্যে রয়েছে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের চুনাপাথরের গুহা ও কাদার আগ্নেয়গিরি, সমুদ্রঘেরা দুটি আগ্নেয় দ্বীপ এবং ছত্তিশগড়ের প্রাচীন মন্দির ও বৌদ্ধবিহারসমৃদ্ধ জনপদ।
২০ অক্টোবর ইউনেসকোয় ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি দল এই সংযোজনের ঘোষণা দেয়। তালিকায় জায়গা পাওয়া স্থানগুলো হলো বারাতাংয়ের কার্স্ট-মাড ভলকানো কমপ্লেক্স, আন্দামান সাবডাকশন আগ্নেয়গিরি এবং সিরপুরের সাংস্কৃতিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক ভূদৃশ্য।
প্রকৃতির বিরল গঠন, আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ, জীববৈচিত্র্য ও প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শনের কারণে স্থানগুলো বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। সম্ভাব্য তালিকায় অন্তর্ভুক্তি এগুলোর বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পাওয়ার প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তবে এ তালিকায় নাম ওঠা মানেই চূড়ান্তভাবে বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা পাওয়া নয়।
১. বারাতাংয়ের চুনাপাথরের গুহা ও কাদার আগ্নেয়গিরি
আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের বারাতাং পরিচিত চুনাপাথরের গুহা ও কাদার আগ্নেয়গিরির জন্য। দীর্ঘ সময় ধরে পানির প্রভাবে চুনাপাথর ক্ষয় হয়ে এসব গুহা তৈরি হয়েছে। গুহার ভেতরে রয়েছে নানা ধরনের প্রাকৃতিক কক্ষ ও খনিজের গঠন, যা ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের ইতিহাস তুলে ধরে।
সাধারণ আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের সময় লাভা বেরিয়ে আসে। তবে কাদার আগ্নেয়গিরি থেকে বেরিয়ে আসে ভূগর্ভের কাদা, পানি ও গ্যাস। এই ভিন্নধর্মী ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য বারাতাংকে আন্দামানের পরিচিত সমুদ্রসৈকতকেন্দ্রিক চিত্রের বাইরে এক ভিন্ন রূপ দিয়েছে।
এলাকাটি বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বারাতাংয়ের মহাদেব গুহার ভেতরে থাকা প্রাকৃতিক গঠন নিয়ে গবেষণা করেছেন বিজ্ঞানীরা। এসব গঠন বিশ্লেষণ করে কয়েক শতাব্দী ধরে ভারতের গ্রীষ্মকালীন মৌসুমি বায়ুর পরিবর্তন সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার চেষ্টা চলছে। ফলে ভূতত্ত্ব ও জলবায়ু নিয়ে গবেষণায়ও স্থানটির গুরুত্ব রয়েছে।
২. আন্দামানের আগ্নেয় দ্বীপ ব্যারেন আইল্যান্ড ও নারকোন্ডাম
আন্দামান সাবডাকশন আগ্নেয়গিরি নামের প্রস্তাবিত ঐতিহ্যস্থলের অন্তর্ভুক্ত দুটি দ্বীপ হলো ব্যারেন আইল্যান্ড ও নারকোন্ডাম। আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ, ভূপ্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের দিক থেকে দ্বীপ দুটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
ব্যারেন আইল্যান্ডে রয়েছে ভারতের একমাত্র নিশ্চিতভাবে সক্রিয় আগ্নেয়গিরি। ১৭৮৭ সাল থেকে এর কার্যকলাপের নথি পাওয়া যায়। ২০২৫ সাল ও ২০২৬ সালের শুরুর দিকেও আগ্নেয়গিরিটির সক্রিয়তার খবর পাওয়া গেছে। বারবার অগ্ন্যুৎপাতের ফলে দ্বীপটির ভূপ্রকৃতিতে পরিবর্তন এসেছে। আশপাশের সমুদ্রেও রয়েছে নানা ধরনের সামুদ্রিক প্রাণী।
অন্যদিকে, নারকোন্ডাম একটি বনাচ্ছাদিত আগ্নেয় দ্বীপ। এখানে পাওয়া যায় নারকোন্ডাম হর্নবিল নামের বিরল পাখি, যা পৃথিবীর অন্য কোথাও প্রাকৃতিকভাবে দেখা যায় না। দ্বীপটিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। এ কারণে এটি সাধারণ পর্যটকদের নিয়মিত ভ্রমণের জায়গা নয়।
আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ এবং বিচ্ছিন্ন দ্বীপে গড়ে ওঠা বাস্তুতন্ত্র নিয়ে গবেষণার জন্য ব্যারেন আইল্যান্ড ও নারকোন্ডাম গুরুত্বপূর্ণ। এখানকার ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি স্বতন্ত্র জীববৈচিত্র্যও বিজ্ঞানীদের আগ্রহের বিষয়।
৩. মহানদীর তীরে প্রাচীন জনপদ সিরপুর
ছত্তিশগড় রাজ্যের মহাসমুন্দ জেলায় মহানদীর তীরে অবস্থিত সিরপুর। পঞ্চম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। এখানকার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে হিন্দু মন্দির, বৌদ্ধবিহার ও জৈন স্থাপনা। এসব নিদর্শন থেকে এই অঞ্চলের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
সিরপুরের পরিচিত স্থাপনাগুলোর একটি লক্ষ্মণ মন্দির। ইট দিয়ে তৈরি এই মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী এবং প্রবেশদ্বারের সূক্ষ্ম কারুকাজ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রাচীন ভারতীয় স্থাপত্যের নিদর্শন হিসেবে মন্দিরটি ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বে আগ্রহীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
সিরপুরের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে জানা যায়, একসময় এখানে ধর্মীয় স্থাপনার পাশাপাশি মানুষের বসতবাড়ি, বাজার ও কারুশিল্পের কর্মকাণ্ডও ছিল। অর্থাৎ, জনপদটি ছিল প্রাচীন ভারতের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনেরও একটি অংশ। এখানকার নিদর্শনগুলো প্রাচীন নগরজীবন, বাণিজ্য এবং বিভিন্ন ধর্মের বিকাশ সম্পর্কে জানতে সহায়তা করে।
প্রকৃতির বিরল ভূতাত্ত্বিক গঠন থেকে শুরু করে আগ্নেয় দ্বীপের জীববৈচিত্র্য ও প্রাচীন সভ্যতার স্মারক ভারতের এই তিন স্থান দেশটির প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক বৈচিত্র্যের ভিন্ন ভিন্ন দিক তুলে ধরে। ইউনেসকোর সম্ভাব্য তালিকায় অন্তর্ভুক্তির ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এসব স্থানের ঐতিহ্যগত গুরুত্ব আরও পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।