পর্যটন মানে ভ্রমণের পাশাপাশি এটি অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, সংস্কৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণেরও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সমুদ্রসৈকত, বন, পাহাড় ও ঐতিহাসিক নিদর্শনে সমৃদ্ধ বাংলাদেশে পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। তবে প্রশ্ন হলো, সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে দেশের পর্যটন খাত কতটা এগিয়েছে?
উন্নত পর্যটন ব্যবস্থাপনার মূল দর্শন হলো পর্যটকের সন্তুষ্টি, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কল্যাণ, পরিবেশ সংরক্ষণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা। অর্থাৎ, শুধু হোটেল-রিসোর্ট নির্মাণ নয়। নিরাপদ ভ্রমণ, মানসম্মত সেবা, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই আধুনিক পর্যটন ব্যবস্থাপনার লক্ষ্য। এ ক্ষেত্রে টেকসই পর্যটন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে বর্তমানের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রকৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা হয়।
কক্সবাজার, সুন্দরবন, সিলেটের চা-বাগান, পার্বত্য চট্টগ্রাম, কুয়াকাটা, পাহাড়পুর ও বাগেরহাটের ঐতিহাসিক নিদর্শন বাংলাদেশের পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। এসব গন্তব্যকে কেন্দ্র করে স্থানীয় খাবার, হস্তশিল্প, লোকসংস্কৃতি ও গ্রামীণ জীবনধারা যুক্ত করা গেলে কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতি আরও সমৃদ্ধ হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের ‘সমৃদ্ধি ডেটা৩৬০’ প্ল্যাটফর্মের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের জিডিপিতে ভ্রমণ ও পর্যটন খাতের অবদান ছিল ২ দশমিক ৯ শতাংশ। একই সময়ে মোট কর্মসংস্থানে এ খাতের অবদান ছিল ৪ দশমিক ২ শতাংশ। অন্যদিকে, বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ২০২৪ সালের ভ্রমণ ও পর্যটন উন্নয়ন সূচকে ১১৯টি অর্থনীতির মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১০৯তম। এসব তথ্য পর্যটন খাতের অর্থনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি উন্নয়নের সীমাবদ্ধতাও তুলে ধরে।
বিদেশি দর্শনার্থীর পরিসংখ্যানেও উদ্বেগের চিত্র রয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে বিদেশি দর্শনার্থী এসেছেন ৫ লাখ ৮৫ হাজার ১৪৫ জন। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৬ লাখ ৩৩ হাজার ৯৪। অর্থাৎ, এক বছরে দর্শনার্থীর সংখ্যা কমেছে ৭ দশমিক ৬ শতাংশ। তবে এ পরিসংখ্যানে শুধু অবকাশযাপনের পর্যটক নয়, ব্যবসায়ী ও অন্যান্য উদ্দেশ্যে আসা বিদেশি দর্শনার্থীরাও অন্তর্ভুক্ত।
বাংলাদেশের পর্যটন খাতে হোটেল, রিসোর্ট, পরিবহন ও অনলাইন বুকিংসেবার বিস্তার ঘটেছে। দেশীয় পর্যটনের বাজারও বেড়েছে। তবে অনেক পর্যটনকেন্দ্রে পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ পরিবহন, গণশৌচাগার, প্রশিক্ষিত গাইড ও জরুরি চিকিৎসাসেবার ঘাটতি রয়েছে। পর্যটন মৌসুমে অতিরিক্ত ভিড়, যানজট ও অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক কার্যক্রমও পর্যটকের অভিজ্ঞতাকে ব্যাহত করে।
পরিবেশ সংরক্ষণ আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। সুন্দরবন, সেন্ট মার্টিন ও পার্বত্য অঞ্চলের মতো সংবেদনশীল এলাকায় অপরিকল্পিত পর্যটন জীববৈচিত্র্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই পর্যটকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত ধারণক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা করা জরুরি।
বাংলাদেশের পর্যটন খাতকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, মানসম্মত সেবা, পর্যটকদের নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল তথ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পর্যটন ব্যবসার অংশীদার করা, বিদেশে বাংলাদেশের পর্যটন আকর্ষণ তুলে ধরা এবং পর্যটকদের সন্তুষ্টি ও ব্যয়ের নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
পর্যটন উন্নয়নের সাফল্য শুধু পর্যটকের সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। কর্মসংস্থান, স্থানীয় মানুষের আয়, সেবার মান এবং পরিবেশের সুরক্ষাও এ ক্ষেত্রে সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পে সম্ভাবনা রয়েছে, তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তব সাফল্যে রূপ দিতে প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা। পর্যটককে ভালো অভিজ্ঞতা দেওয়া, স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা এবং প্রকৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ- এই তিন লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করতে পারলেই বাংলাদেশের পর্যটন খাত টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাবে।