অনলাইন বুকিংয়ে প্রতারণার ঝুঁকি, বুকিংডটকম-এর বিরুদ্ধে ইইউর তদন্ত

ভ্রমণের পরিকল্পনা থেকে হোটেল বুকিং- সবকিছুই এখন অনেক সহজ করেছে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। তবে এর সঙ্গে বাড়ছে প্রতারণার ঝুঁকিও। ভুয়া হোটেল তালিকা, বুকিংয়ের তথ্য ব্যবহার করে প্রতারণা এবং বিজ্ঞাপনের স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে বুকিংডটকম-এর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে ইউরোপীয় কমিশন (ইইউ)।

কমিশনের উদ্ধৃত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইউরোপে অনলাইনে হোটেল বুকিংয়ের প্রায় ৬৬ শতাংশ বুকিংডটকম-এর মাধ্যমে হয়ে থাকে। অন্যদিকে, প্ল্যাটফর্মটি জানিয়েছে, ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রতারণামূলক কার্যক্রম ৫০০ শতাংশ বেড়েছে।

২১ অক্টোবর শুরু হওয়া তদন্তে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট (ডিএসএ) অনুযায়ী বুকিংডটকম-এর দায়িত্ব পালনের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। ভুয়া আবাসনের তালিকা ও ফিশিং প্রতারণার ঝুঁকি শনাক্ত, মূল্যায়ন এবং কমাতে প্রতিষ্ঠানটি যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েছে কি না, তা তদন্তের অন্যতম লক্ষ্য।

ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট অনুযায়ী, অতি বৃহৎ অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোকে ব্যবহারকারীদের জন্য তৈরি হওয়া পদ্ধতিগত ঝুঁকি শনাক্ত করে তা কমানোর ব্যবস্থা নিতে হয়। একই সঙ্গে বিজ্ঞাপনের বিষয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও তাদের দায়িত্ব। তদন্তে এসব বিধি পালনের বিষয়টি মূল্যায়ন করবে ইউরোপীয় কমিশন।

তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্ল্যাটফর্মে থাকা প্রতারণামূলক ও নিয়মবহির্ভূত আবাসনের তালিকা। এর মধ্যে রয়েছে অস্তিত্বহীন হোটেল বা আবাসন, অন্যের পরিচয় ব্যবহার করে পরিচালিত তালিকা এবং বিভ্রান্তিকর বুকিং অফার। এসবের কারণে ভ্রমণকারীরা অর্থ হারানো কিংবা নির্ধারিত স্থানে গিয়ে আবাসন না পাওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

বুকিংয়ের তথ্য ও অতিথিদের ব্যক্তিগত তথ্য অসাধু ব্যক্তিদের হাতে পৌঁছেছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে। এসব তথ্য ব্যবহার করে ভ্রমণকারীদের কাছে ভুয়া বার্তা পাঠানো, অর্থ পরিশোধের অনুরোধ জানানো কিংবা প্রতারণামূলক ওয়েবসাইটে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হতে পারে। এ ধরনের ফিশিং প্রতারণা শনাক্ত ও প্রতিরোধে প্ল্যাটফর্মটির নেওয়া ব্যবস্থাও খতিয়ে দেখা হবে।

সার্চের ফলাফলে অর্থের বিনিময়ে বেশি দৃশ্যমানতা পাওয়া আবাসনগুলোর তালিকা বিজ্ঞাপন হিসেবে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল কি না, তা-ও তদন্ত করবে কমিশন।

ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট অনুযায়ী, ব্যবহারকারীদের বোঝার সুযোগ থাকতে হবে কোন কনটেন্ট বিজ্ঞাপন, এর জন্য কে অর্থ দিয়েছে এবং কেন সেটি তাদের সামনে দেখানো হচ্ছে। কমিশনের অভিযোগ, অর্থের বিনিময়ে বেশি দৃশ্যমানতা পাওয়া কিছু তালিকায় বিজ্ঞাপনের পরিচয় যথেষ্ট স্পষ্ট ছিল না।

অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে তা ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্টের বিধি লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে বুকিংডটকম আইন ভঙ্গ করেছে- এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।

তদন্তের ঘোষণা ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ব্যবহারকারীরা। একজন লিখেছেন, এ গ্রীষ্মে বুকিংডটকম-এর মাধ্যমে প্রতারণার শিকার হওয়ার আগে কখনও এমন অভিজ্ঞতা হয়নি। আরেকজন ইউরোপীয় ইউনিয়নের উদ্যোগকে ডিজিটাল খাতের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার পদক্ষেপ হিসেবে দেখেছেন।

কেউ কেউ প্ল্যাটফর্মে থাকা ভুয়া হোটেল তালিকা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। একজন ব্যবহারকারীর অভিযোগ, কখনও কখনও কয়েক স্তরের উপঠিকাদারের মাধ্যমে দায় অন্যদের ওপর চাপানোর চেষ্টা করা হয়। তবে অন্য এক ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, বুকিংডটকম ব্যবহার করে তার কখনো খারাপ অভিজ্ঞতা হয়নি এবং চলমান বিতর্কের কারণ জানতে চেয়েছেন।

অনলাইন বুকিংয়ের সুবিধা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে বুকিং নিশ্চিত করার আগে হোটেলের ঠিকানা, সাম্প্রতিক অতিথি-পর্যালোচনা, বাতিলের শর্ত এবং পেমেন্টের নিয়ম যাচাই করা জরুরি। অপরিচিত লিংকে গিয়ে অর্থ পরিশোধ না করা এবং সন্দেহজনক বার্তার মাধ্যমে ব্যক্তিগত বা আর্থিক তথ্য না দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপীয় কমিশনের তদন্তের ফলাফল অনলাইন ভ্রমণ বুকিংয়ে নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতার প্রশ্নে নতুন দিকনির্দেশনা দিতে পারে।

সূত্র: এনডিটিভি