বরফ গলছে, তবু থামছে না লাক্স: আল্পসে টেকসই পর্যটনের নতুন স্বপ্ন

ইউরোপের কোনও কোনও স্কি রিসোর্টে এখন শীতের চেনা ছবি বদলে যাচ্ছে। বরফে ঢাকা ঢালের বদলে দেখা মিলছে হলুদ ঘাসের, কোথাও জমে আছে বরফগলা কাদাপানি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আল্পসের বরফ দ্রুত গলছে। এতে হুমকির মুখে পড়ছে ইউরোপের বহু জনপ্রিয় স্কি রিসোর্ট। শীতকালীন পর্যটনের ভবিষ্যৎ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ। বিশেষ করে নিচু উচ্চতার স্কি রিসোর্টগুলোতে বরফের অভাব ক্রমেই বড় সমস্যা হয়ে উঠছে।

তবে সুইজারল্যান্ডের আল্পস পর্বতমালার উঁচুতে অবস্থিত লাক্সে এখনও বরফের দেখা মেলে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় দুই হাজার মিটার উচ্চতায় বিস্তৃত এই স্কি রিসোর্টে তরুণেরা হাফপাইপে জটিল সব কসরত অনুশীলন করছেন। পাশের ঢালে স্কি করছে ছোট ছোট শিশুও। কোথাও আবার দেখা যায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কার সামরিক পোশাক পরা কয়েকজনকে, যারা পুরোনো কাঠের স্কিতে চড়ে পাহাড়ি পথ পাড়ি দিচ্ছেন।

দৃশ্যগুলো যেন শীতকালীন পর্যটনের এক চিরচেনা জগৎ। কিন্তু এই জগৎ কি ভবিষ্যতেও টিকে থাকবে? জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরফের রেখা ক্রমশ ওপরে উঠে গেলে স্কি রিসোর্টগুলোর কী হবে?

লাক্সের উত্তর বেশ স্পষ্ট, পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। শুধু স্কির ওপর নির্ভর করে নয়, বরং পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেই এগিয়ে যেতে চায় এই রিসোর্ট।

লাক্সের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে গুর্টনার পরিবারের নাম। ১৯৬২ সালে রেতো গুর্টনারের বাবা এখানে প্রথম স্কি-লিফট নির্মাণ করেন। আজ ৭১ বছর বয়সী রেতো গুর্টনার ফ্লিমস-লাক্স রিসোর্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা।

তিনি বলেন, উনিশ শতক থেকেই গ্রীষ্মকালে পর্যটকেরা এ অঞ্চলে আসতেন। তবে সে সময় লাক্স ছিল দরিদ্র একটি গ্রাম। পরবর্তী সময়ে শীতকালীন পর্যটনের বিকাশ গ্রামটির পরিচয় বদলে দেয়।

গুর্টনারের নিজের জীবনেও বড় পরিবর্তন আসে ১৯৭০-এর দশকে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, লস অ্যাঞ্জেলেসে (ইউসিএলএ) পড়াশোনার সময় তাঁর পরিচয় হয় স্কেটবোর্ডিংয়ের সঙ্গে। নতুন খেলার স্বাধীনচেতা সংস্কৃতি তাঁকে আকৃষ্ট করে।

তিনি বলেন, স্কেটবোর্ড, মাউন্টেন বাইক কিংবা স্নোবোর্ড যে খেলাতেই কেউ ভালো করুক, সবাই তাকে হাততালি দিয়ে উৎসাহিত করতো। সেখানে জাতীয়তাবাদ কিংবা সামরিকতাবাদের জায়গা ছিল না। তাঁর কাছে এই সংস্কৃতির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক ছিল স্বাধীনতা।

অর্থনীতিতে ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফেরার সময় সঙ্গে নিয়ে আসেন একটি স্নোবোর্ড ও একটি মাউন্টেন বাইক। এরপর হিমবাহের ওপর বেলচা দিয়ে তৈরি করেন প্রথম হাফপাইপ।

এভাবেই পুরোনো ধারার সঙ্গে নতুন ক্রীড়াসংস্কৃতির পরিচয় ঘটাতে থাকেন গুর্টনার। তাঁর এই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় ‘গ্রিনস্টাইল’—প্রযুক্তি, নকশা, পরিবেশসচেতনতা ও আশাবাদী ভবিষ্যৎচিন্তার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি ধারণা।

লাক্সের এই দর্শনের প্রতিফলন দেখা যায় রিসোর্টের নতুন অবকাঠামোতেও। পাশের ফ্লিমস গ্রামের গন্ডোলা ব্যবস্থা তার একটি উদাহরণ।

সাধারণ ব্যবস্থায় যাত্রী থাকুক বা না থাকুক, গন্ডোলা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ওঠানামা করতে পারে। এতে অপ্রয়োজনীয় শক্তি খরচ হয়। নতুন ব্যবস্থায় জটিল অ্যালগরিদমের সাহায্যে স্কিয়াররা পাহাড়ের ওপরের পাঁচটি গন্তব্যের মধ্যে একটি বেছে নিতে পারেন। সেই অনুযায়ী তাদের জন্য আলাদা গন্ডোলা পাঠানো হয়।

স্থানীয় গাইড ডোরিস রেলস্টাবের সঙ্গে এই ব্যবস্থায় চড়ে পাহাড়ের ওপরে উঠতে উঠতে বোঝা যায়, কীভাবে প্রযুক্তির সাহায্যে যাত্রীদের চাহিদা পূরণ এবং জ্বালানির ব্যবহার দুটির মধ্যে ভারসাম্য রাখা সম্ভব।

গন্ডোলায় চড়ে পৌঁছানো যায় সেগনেসে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২ হাজার ১০০ মিটার উচ্চতায়। গাছপালার সীমা পেরিয়ে সেখানে বরফে ঢাকা বাটির মতো উপত্যকা, সামনে খাড়া পাথুরে দেয়াল আর তার মাথায় খাঁজকাটা পর্বতশৃঙ্গ।

এই শৃঙ্গগুলোর নাম চিঙ্গেলহর্নার। পাহাড়ের গায়ে দৃশ্যমান একটি রেখা একসময় ভূতত্ত্ববিদদের কাছে ছিল রহস্য। ১৮৪৮ সালে ভূতত্ত্ববিদ রডেরিক ইম্পে মারচিসন ও স্থানীয় বিশেষজ্ঞ আর্নল্ড এসকার ফন ডের লিন্থ এখানে এসে দেখেছিলেন, অপেক্ষাকৃত নবীন শিলার ওপর অবস্থান করছে আরও প্রাচীন শিলা।

পরে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, প্রাচীন আফ্রিকান টেকটোনিক প্লেটটি অপেক্ষাকৃত নবীন ইউরোপীয় প্লেটের ওপর উঠে এসেছে। ভূতত্ত্বের এই বিস্ময়কর ইতিহাসের পাশাপাশি অঞ্চলটি জীববৈচিত্র্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

গ্রীষ্মকালে এখানে ফোটে আল্পসের বিরল প্রজাতির ফুল। রয়েছে পাহাড়ি আশ্রয়কেন্দ্র, যেখানে পর্যটকেরা রাত কাটাতে পারেন। বরফের ওপর দেখা মেলে খরগোশের পায়ের ছাপ। স্থানীয় গাইডের ভাষ্য অনুযায়ী, নেকড়ে ও লিংক্সের মতো বন্য প্রাণীও আবার এ অঞ্চলে ফিরে এসেছে। আল্পসজুড়ে নেকড়ের সংখ্যা বৃদ্ধির তথ্যও প্রকৃতির পরিবর্তনশীল চিত্র তুলে ধরে।

লাক্সের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দৃষ্টিভঙ্গি হলো, তারা নিজেদের ভবিষ্যৎকে কেবল বরফের সঙ্গে বেঁধে রাখতে চায় না।

গুর্টনারের মতে, হাফপাইপ কিংবা স্নো ফ্রিস্টাইল খেলার মাঠ তৈরিতে খুব বেশি বরফের প্রয়োজন হয় না। আর এই বরফ তৈরিতে তারা জলবিদ্যুৎ ব্যবহার করে। রিসোর্টে মাউন্টেন বাইক চালানো এবং পাহাড়ি পথে হাঁটার মতো বিকল্প কার্যক্রমও রয়েছে।

এদিকে পাহাড়ের কিছু স্কি-রানে প্রাকৃতিক বরফ গলে যাওয়ার পরও সাদা তুষারের সরু, প্রশস্ত ফিতা দেখা যায়। এগুলো কৃত্রিম তুষারে তৈরি স্কি-পথ। আল্পসের বহু স্কি রিসোর্টের মতো লাক্সও কৃত্রিম তুষার ব্যবহার করে। কৃত্রিম তুষার প্রাকৃতিক তুষারের চেয়ে বেশি সময় টিকে থাকতে পারে।

লাক্সের পাশের গ্রাম ফালেরায় পৌঁছালে পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনের আরেক রূপ দেখা যায়। গ্রামের ভেতরে হাতে তৈরি কাঠের শস্যাগার, পরিপাটি করে সাজানো কাঠের গাদা, আর চোখে পড়ার মতো গাড়ির অনুপস্থিতি। লাক্স যেখানে প্রযুক্তি ও আধুনিক ব্যবস্থার সাহায্যে কার্বন নিঃসরণ কমানোর চেষ্টা করছে, ফালেরাকে দেখে মনে হয়, সেখানে জীবনযাত্রা তুলনামূলক ধীর ও ঐতিহ্যনির্ভর।

প্রকৃতি, প্রযুক্তি ও মানুষের জীবনযাত্রা সবকিছুই বদলাচ্ছে। সেই পরিবর্তনের মধ্যে লাক্সের চেষ্টা হলো, বরফ কমে গেলেও পাহাড়কে পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় রাখা এবং পরিবেশের ওপর চাপ যতটা সম্ভব কমানো।

লাক্সের স্কি রিসোর্টের গল্প এমন এক পাহাড়ি অঞ্চলের গল্প, যেখানে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তাকে অস্বীকার না করে নতুনভাবে বাঁচার পথ খোঁজা হচ্ছে। বরফ থাকবে কি থাকবে না, তার নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু প্রকৃতিকে সঙ্গে নিয়ে পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করার চেষ্টা থেমে নেই।