বর্ষায় জলরঙের ক্যানভাস, শীতে সোনালি শস্যের রাজ্য চলনবিল

বর্ষার আকাশে মেঘের আনাগোনা, চারদিকে থইথই পানি, তার বুক চিরে এগিয়ে চলেছে ছোট ছোট নৌকা। কোথাও জেলেদের মাছ ধরার ব্যস্ততা, কোথাও পানির ওপর দুলছে জলজ উদ্ভিদ, আবার দূরে দেখা যায় সবুজ গ্রাম আর বিস্তীর্ণ জনপদ। প্রকৃতির এমন রূপ দেখতে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন দেশের অন্যতম বৃহৎ জলাভূমি চলনবিল থেকে। বর্ষায় যার রূপ জলরঙে আঁকা ছবির মতো, আর শীতের শুষ্ক মৌসুমে সেই জলভূমিই হয়ে ওঠে ফসলের মাঠ।

নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা এই তিন জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে আছে চলনবিল। এটি আসলে একক কোনও বিল নয়। ছোট-বড় অসংখ্য বিল, জলাশয় ও নদীর সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এই বিশাল জলাভূমি। বর্ষায় আশপাশের বিলগুলো পানিতে ভরে একাকার হয়ে তৈরি করে বিস্তীর্ণ জলরাশি। আর বর্ষা শেষে পানি কমে এলে জেগে ওঠে উর্বর জমি, শুরু হয় কৃষিকাজ।

বর্ষায় চলন বিল (ছবি: সংগৃহীত)

বর্ষায় চলনবিলের অন্য রকম সৌন্দর্য

চলনবিল ভ্রমণের সবচেয়ে আকর্ষণীয় সময় জুলাই থেকে অক্টোবর। এ সময় পানিতে ভরে ওঠে বিলের বিস্তীর্ণ এলাকা। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, মাঠ-ঘাট, খাল-বিল আর গ্রামের সীমানা মুছে গিয়ে চারদিকে তৈরি হয়েছে এক বিশাল জলরাজ্য। নৌকায় চড়ে সেই জলরাশির ভেতর দিয়ে ঘুরে বেড়ানোই হতে পারে ভ্রমণের অন্যতম আনন্দ।

পানির ওপর দিয়ে নৌকা এগিয়ে যাওয়ার সময় চোখে পড়তে পারে গ্রামীণ জীবনের নানা দৃশ্য। কোথাও জেলেরা মাছ ধরছেন, কোথাও কৃষকেরা ব্যস্ত ফসলের জমি নিয়ে, আবার কোথাও গ্রামের মানুষ দৈনন্দিন কাজে ছুটছেন। শহরের কোলাহল থেকে দূরে এমন পরিবেশে সময় কাটানো মানেই প্রকৃতির কাছাকাছি ফিরে যাওয়া।

চলন বিলে নৌকায় মালামাল পারাপার (ছবি: সংগৃহীত)

চলনবিলের সৌন্দর্য অবশ্য শুধু বর্ষার পানিতে সীমাবদ্ধ নয়। শুকনো মৌসুমে পানি নেমে গেলে বিলের উর্বর মাটিতে ধানসহ বিভিন্ন ফসলের চাষ হয়। তখন যে বিস্তীর্ণ জলরাশি বর্ষায় নৌকার পথ তৈরি করে, সেই জমিতেই কৃষকেরা ফলান সোনালি ফসল। ঋতু বদলের সঙ্গে চলনবিলের এই রূপান্তরই এলাকাটিকে করে তুলেছে বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত।

জলাভূমির বুকজুড়ে মাছের রাজ্য

চলনবিল শুধু প্রকৃতিপ্রেমীদের আকর্ষণ করে না, স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। এখানকার মানুষের কাছে বিলটি শস্যভাণ্ডার, আবার মৎস্যসম্পদেরও গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বর্ষার শেষ দিকে বিভিন্ন এলাকায় মাছ ধরার ব্যস্ততা বেড়ে যায়।

শীতের শুষ্ক মৌসুমে সেই জলভূমিই হয়ে ওঠে ফসলের মাঠ (ছবি: সংগৃহীত)

এ অঞ্চলে দেশি পুঁটি, গজার, বোয়াল, শোল, টাকি, টেংরা, খলসে, বাইন, চিতল, শিংসহ নানা ধরনের দেশি মাছ পাওয়া যায়। রয়েছে কাঁকড়াও। বিলের পানি ও জলজ পরিবেশ স্থানীয় মৎস্যসম্পদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

চলনবিলের আরেকটি আকর্ষণ এর সাধারণ গ্রামীণ জীবন। ভোরে কৃষকের মাঠে যাওয়ার দৃশ্য, জলাভূমির পাশে মানুষের ব্যস্ততা কিংবা বর্ষার পানিতে নৌকা চলাচল মিলে এখানে দেখা মেলে বাংলার চিরচেনা অথচ মুগ্ধকর এক জীবনচিত্রের।

চলন বিলে বুক চিরে ছুটে চলেছে ট্রেন (ছবি: সংগৃহীত)

কোথায় ঘুরবেন চলনবিলে?

চলনবিলের বড় একটি অংশ নাটোর জেলার সিংড়া উপজেলায় অবস্থিত। এ ছাড়া সিরাজগঞ্জের তাড়াশ ও রায়গঞ্জ এবং পাবনার চাটমোহরসহ বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে রয়েছে বিলের অংশবিশেষ। পাবনা অঞ্চলে গাজনা, বড়বিল, সোনাপাতিলা, ঘুঘুদহ, চিরল ও গুরকাসহ বেশ কয়েকটি বড় বিল রয়েছে।

চাটমোহর উপজেলা সদর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে চলনবিলের একটি অংশে যাওয়া যায়। পাবনা জেলা সদর থেকে বাসে চাটমোহরে পৌঁছে সেখান থেকে রিকশা বা স্থানীয় যানবাহনে বিলের কাছাকাছি যাওয়া সম্ভব। অন্যদিকে নাটোরের সিংড়া এলাকাও চলনবিল ঘুরে দেখার জন্য উল্লেখযোগ্য স্থান।

বিলের বিস্তীর্ণ জলরাশি কাছ থেকে দেখতে স্থানীয়ভাবে নৌকা ভাড়া করার সুযোগ রয়েছে। সারাদিনের জন্য সাধারণ নৌকার ভাড়া প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা এবং ইঞ্জিনচালিত নৌকার ভাড়া প্রায় ১ হাজার থেকে ২ হাজার টাকা।

ঘুরে আসুন চলনবিল জাদুঘর থেকেও

চলনবিল ভ্রমণে বাড়তি আকর্ষণ যোগ করতে পারেন গুরুদাসপুর উপজেলার খুবজিপুর গ্রামের চলনবিল জাদুঘর ঘুরে দেখে। স্থানীয় শিক্ষক আব্দুল হামিদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে ১৯৭৮ সালে তাঁর নিজ বাড়িতে এই সংগ্রহশালা গড়ে ওঠে। এখানে চলনবিল অঞ্চলে পাওয়া বিভিন্ন নিদর্শন, মাছ ধরার সরঞ্জাম এবং নানা ধরনের সংগ্রহ রয়েছে। নাটোর থেকে গুরুদাসপুরে গিয়ে স্থানীয় যানবাহনের সহায়তায় খুবজিপুর গ্রামে পৌঁছানো যায়।

চলনবিলের সৌন্দর্য একেক ঋতুতে একেক রকম। বর্ষায় এটি নৌকার রাজ্য, আর পানি নেমে গেলে উর্বর জমিতে শুরু হয় ফসলের উৎসব। প্রকৃতি, জলাভূমি, গ্রামীণ জীবন আর বাংলার কৃষিনির্ভর ঐতিহ্যকে একসঙ্গে দেখতে চাইলে চলনবিল হতে পারে আপনার পরবর্তী ভ্রমণের গন্তব্য। এখানে গেলে চোখ জুড়ানো দৃশ্যের পাশাপাশি দেখা মিলবে নদী-বিল আর মানুষের জীবনকে ঘিরে গড়ে ওঠা বাংলাদেশের এক জীবন্ত জনপদ।