দুই শতাব্দীর স্মৃতি বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে কলাকোপার ব্রজ নিকেতন

পুরোনো দিনের স্থাপত্য, কারুকার্যময় ভবন আর হারিয়ে যাওয়া জমিদারি আমলের গল্প যাদের টানে, তাদের জন্য ঢাকার কাছেই রয়েছে এক আকর্ষণীয় ভ্রমণগন্তব্য। ঢাকার নবাবগঞ্জের কলাকোপায় দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো কোকিলপেয়ারী জমিদারবাড়ি, যা ‘ব্রজ নিকেতন’ নামেও পরিচিত। সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে বাড়ির মালিকানা, হারিয়ে গেছে জমিদারি আমলের জৌলুস। তবু পুরোনো স্থাপত্যের গায়ে লেগে রয়েছে ইতিহাসের ছাপ।

কথিত আছে, কোকিলপেয়ারী জমিদার ব্রজেন রায়, যিনি সুদর্শন রায় নামেও পরিচিত ছিলেন, প্রায় দুই শতাব্দী আগে এই কারুকার্যময় বাড়িটি নির্মাণ করেন। চার একরেরও বেশি জমির ওপর বাগানঘেরা পরিবেশে গড়ে ওঠা বাড়িটির নির্মাণশৈলী আজও দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে।

এই বাড়ির ইতিহাস অবশ্য পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। বিভিন্ন সূত্রে এর পরিচয় নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, এগুলো জমিদারবাড়ি নয়, বরং একসময়কার বিত্তশালী ব্যক্তিদের বসতবাড়ি। আবার অন্য তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় ধনবান ব্যক্তিরা বাড়িগুলো কিনেছিলেন এক পতনোন্মুখ জমিদার পরিবারের উত্তরসূরির কাছ থেকে। ফলে বাড়িগুলোর সঙ্গে জমিদারি ইতিহাসের সম্পর্ক একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।

স্থানীয়ভাবে প্রচলিত একটি ধারণা অনুযায়ী, কোকিলপেয়ারী জমিদার ব্রজেন রায়ের পাঁচ ছেলে ছিলেন। কথিত আছে, তিনি নিজের মূল জমিদারবাড়িটি ছোট ছেলের জন্য রেখে গিয়েছিলেন এবং বাকি চার ছেলের জন্য আরও চারটি বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন। বাড়িগুলো স্থানীয় মানুষের কাছে ‘তেলিবাড়ি’ নামেও পরিচিত।

নামটির পেছনেও রয়েছে মালিকানা বদলের গল্প। প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে বাড়িগুলোর মালিকানা এক তেল ব্যবসায়ীর হাতে চলে যাওয়ায় এই নাম চালু হয়। তবে এসব তথ্যের সবগুলোর পক্ষে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক দলিল পাওয়া যায় না। তাই বাড়িগুলো ঘুরে দেখার পাশাপাশি স্থানীয় ইতিহাসের এই নানা বয়ান জানাও হতে পারে ভ্রমণের আকর্ষণ।

কোকিলপেয়ারী জমিদারবাড়ির আশপাশে রয়েছে আরও কিছু পুরোনো স্থাপনা। কাছেই বৌদ্ধ মন্দির, শ্রীলোকনাথ সাহার বাড়ি, তেলিবাড়ি, উকিলবাড়ি ও দাসবাড়ির মতো জায়গা রয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে পরিচিত। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে পাশাপাশি থাকা কয়েকটি ঐতিহাসিক স্থাপনা ঘুরে দেখার সুযোগ পাবেন।

পুরোনো বাড়িগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে চোখে পড়ে অতীতের নির্মাণরীতি ও স্থাপত্যের ভিন্নতা। প্রতিটি ভবনের পেছনে রয়েছে আলাদা গল্প, যদিও সব গল্পের নির্ভরযোগ্য নথি সহজে মেলে না। ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে এই অনিশ্চয়তাও অনুসন্ধানের একটি অংশ, কোনটি প্রতিষ্ঠিত তথ্য, আর কোনটি লোকমুখে প্রচলিত কাহিনি, তা বোঝার চেষ্টা।

ঢাকা থেকে সড়কপথে নবাবগঞ্জের কলাকোপায় যাওয়া যায়। নয়াবাজারের বুড়িগঙ্গা সেতু হয়ে অথবা তৃতীয় বুড়িগঙ্গা সেতুর দিক দিয়ে দোহার-নবাবগঞ্জ অঞ্চলের পথে কলাকোপায় পৌঁছানো সম্ভব। সেখানে গিয়ে স্থানীয়দের কাছে ‘জজবাড়ি’ বা কোকিলপেয়ারী জমিদারবাড়ির পথ জানতে চাইলে গন্তব্য খুঁজে পেতে সুবিধা হতে পারে।

বাংলাদেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে জমিদারবাড়ি, রাজবাড়ি ও পুরোনো স্থাপত্যের নিদর্শন। কিন্তু যথাযথ সংরক্ষণ, নির্ভরযোগ্য ইতিহাসচর্চা এবং পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাবে অনেক জায়গাই রয়ে গেছে আড়ালে। কলাকোপার কোকিলপেয়ারী জমিদারবাড়িও সেই ঐতিহ্যের অংশ, যার অতীত সম্পর্কে আরও গবেষণা ও তথ্য সংরক্ষণের সুযোগ রয়েছে।

ছুটির দিনে ঢাকার কাছেই ইতিহাসঘেরা পরিবেশে সময় কাটাতে চাইলে নবাবগঞ্জের কলাকোপা হতে পারে এক দিনের ভ্রমণের পরিকল্পনা। পুরোনো ভবন, স্থানীয় জনপদ আর জমিদারি আমলের গল্প মিলিয়ে এই সফর শুধু ঘোরাঘুরি নয়, অতীতকে নতুন করে জানারও সুযোগ।