মাটির দেয়ালে রঙের জাদু, পুরো গ্রাম যেন শিল্পীর ক্যানভাস!

ইট-পাথরের শহরে বাড়ির দেয়াল সাজাতে মানুষ কত কিছুই না করেন! কেউ দামি রং লাগান, কেউ ওয়ালপেপার, আবার কেউ দেয়ালে টাঙান শৌখিন ছবি। কিন্তু বাংলাদেশের একটি গ্রামে সাজসজ্জার গল্পটা একেবারেই আলাদা। এখানে মাটির ঘরের দেয়ালই ক্যানভাস, আর গ্রামের গৃহিণীরা সেই ক্যানভাসের শিল্পী। তাদের হাতের আঁচড়ে সাধারণ মাটির বাড়িও হয়ে ওঠে রঙিন শিল্পকর্ম। গ্রামের নাম টিকইল, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার এক অনন্য জনপদ, যা পরিচিত ‘আল্পনা গ্রাম’ নামে।

টিকইলে ঢুকলে মনে হতে পারে, কেউ যেন গোটা গ্রামটিকে রঙের তুলিতে সাজিয়ে দিয়েছেন। বাড়ির বাইরের দেয়াল থেকে শুরু করে ঘরের ভেতর, রান্নাঘর থেকে শোবার ঘর কোথাও বাদ পড়ে না আলপনার ছোঁয়া। মাটির দেয়ালে আঁকা নকশা আর নানা রঙের কারুকাজে প্রতিটি বাড়িই যেন আলাদা এক শিল্পকর্ম। এখানে সৌন্দর্য দেখার জন্য কোনো গ্যালারিতে যেতে হয় না। বাড়ির উঠোনে দাঁড়ালেই চোখের সামনে খুলে যায় লোকশিল্পের এক বিস্ময়কর জগৎ।

টিকইল গ্রামের আলপনার মূল কারিগর নারীরা (ছবি: সংগৃহীত)

রং-তুলির কারিগর গ্রামের গৃহিণীরা

টিকইল গ্রামের আলপনার মূল কারিগর নারীরা। বংশপরম্পরায় তারা এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শেখা নকশা আর নিজেদের সৃজনশীলতা মিলিয়ে মাটির দেয়ালে ফুটিয়ে তোলেন নানা নকশা। কখনও উৎসবের আনন্দ, কখনও পারিবারিক উপলক্ষ, আবার কখনো নিছক ঘর সাজানোর ইচ্ছাসহ আলপনা আঁকার পেছনে থাকে নানা অনুপ্রেরণা।

মজার ব্যাপার হলো, এই শিল্পের উপকরণও আসে প্রকৃতি থেকেই। আগে আলপনা আঁকতে গিরিমাটি, চক বা খড়িমাটি, রং ও তারপিন তেল ব্যবহার করা হতো। কিন্তু সেসব উপকরণে আঁকা নকশা বেশিদিন টিকত না। তাই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রং তৈরির কৌশলেও এসেছে পরিবর্তন।

প্রতিটি বাড়িই যেন আলাদা এক শিল্পকর্ম (ছবি: সংগৃহীত)

বর্তমানে শুকনো বরইয়ের গুঁড়া, আঠা, গিরিমাটি, পুরোনো আমের আঁটির শাঁসের গুঁড়া, চকগুঁড়া, বিভিন্ন রং এবং মানকচু ও কলাগাছের কষ দিয়ে তৈরি করা হয় রঙের মিশ্রণ। মিশ্রণটি চার-পাঁচ দিন ভিজিয়ে রাখার পর তা দিয়ে আঁকা হয় আলপনা। এতে নকশা এক বছরেরও বেশি সময় টিকে থাকে।

দেয়ালে দেয়ালে উৎসবের আমেজ

টিকইলের মানুষের কাছে আলপনা মানে বাড়ির সৌন্দর্য বাড়ানোর উপায় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশ্বাস, আনন্দ আর পারিবারিক ঐতিহ্য। স্থানীয়দের বিশ্বাস, আলপনা আঁকলে ঘরে পবিত্রতার অনুভূতি আসে, পরিবারের সদস্যদের মনেও আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে দেবতার আশীর্বাদ কামনা করেও বাড়ির দেয়ালে আলপনা আঁকেন।

বাড়ির উঠোনে দাঁড়ালেই চোখে পড়ে লোকশিল্পের এক বিস্ময়কর জগৎ (ছবি: সংগৃহীত)

বিভিন্ন পার্বণ, পূজা ও আনন্দের উপলক্ষে গ্রামের বাড়িগুলো সেজে ওঠে নতুন নকশায়। তখন মাটির দেয়ালগুলো যেন আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। একেকটি বাড়ি একেক রকম, একেকটি নকশায় লুকিয়ে থাকে শিল্পীর নিজস্ব ভাবনা। একই গ্রামে থেকেও প্রতিটি বাড়ির সাজে থাকে আলাদা বৈশিষ্ট্য।

এই ঐতিহ্যের শুরু ঠিক কবে, তা গ্রামের প্রবীণরাও নিশ্চিত করে বলতে পারেন না। তবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নারীরা এই শিল্পচর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন। একসময় বাড়ির দেয়ালের আলপনার সৌন্দর্য দেখেও নাকি বিয়ে নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতেন পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠরা। অর্থাৎ, দেয়ালের নকশা শুধু বাড়ির সৌন্দর্য নয়, কখনও কখনও পরিবারের রুচি ও দক্ষতার পরিচয়ও বহন করতো।

এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশ্বাস, আনন্দ আর পারিবারিক ঐতিহ্য (ছবি: সংগৃহীত)

শহুরে ব্যস্ততা থেকে একটু রঙিন বিরতি

যারা ভ্রমণে গিয়ে পাহাড়, সমুদ্র কিংবা ঐতিহাসিক স্থাপনার বাইরে নতুন কিছু দেখতে চান, তাদের জন্য টিকইল হতে পারে ভিন্ন স্বাদের গন্তব্য। এখানে নেই বড় কোনও পর্যটন আয়োজনের চাকচিক্য। বরং রয়েছে গ্রামীণ জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ, মাটির বাড়ি আর মানুষের হাতে গড়ে ওঠা শিল্পের সৌন্দর্য।

এই গ্রামের বিশেষত্ব হলো, আলপনা কোনও একক শিল্পীর প্রদর্শনীর বিষয় নয়। এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। বাড়ির দেয়াল সাজাতে সাজাতেই নারীরা ধরে রেখেছেন নিজেদের ঐতিহ্য। ফলে টিকইল ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতা কেবল রঙিন নকশা দেখায় সীমাবদ্ধ থাকে না। গ্রামীণ লোকশিল্পের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কও বুঝতে সাহায্য করে।

প্রতিটি বাড়ির সাজে থাকে আলাদা বৈশিষ্ট্য (ছবি: সংগৃহীত)

কীভাবে যাবেন টিকইল আল্পনা গ্রামে?

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সদর থেকে প্রায় ২৪ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে নাচোল উপজেলায় অবস্থিত টিকইল গ্রাম। এটি নেজামপুর ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত, যে এলাকা তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী ইলা মিত্রের স্মৃতির সঙ্গেও জড়িত।

ঢাকা থেকে সড়কপথে চাঁপাইনবাবগঞ্জ গিয়ে সেখান থেকে বাস, ট্যাক্সি বা স্থানীয় যানবাহনে নাচোলের দিকে যাওয়া যায়। এরপর স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে টিকইল গ্রামে পৌঁছানো সম্ভব। চাঁপাইনবাবগঞ্জের সঙ্গে নাচোলের রেল যোগাযোগও রয়েছে।

ঢাকা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের দূরত্ব প্রায় ৩১৭ কিলোমিটার। গাবতলী, কল্যাণপুরসহ ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী বাস পাওয়া যায়।

টিকইল হয়তো বড় কোনও পর্যটন শহর নয়, কিন্তু এর প্রতিটি রঙিন দেয়ালে লুকিয়ে আছে মানুষের সৃজনশীলতা আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা ঐতিহ্য। এখানে মাটির ঘর মানেই সাদামাটা দেয়ালের পরিবর্তে শিল্পীর ক্যানভাস। আর গ্রামের নারীদের হাতে আঁকা সেই ক্যানভাসই টিকইলকে দিয়েছে সারা দেশে আলাদা পরিচিতি।