শহরের কোলাহল থেকে দূরে, চারপাশে ফলের বাগান আর গাছপালা। জানলার বাইরে চোখ রাখলেই দেখা যায় সবুজের সমারোহ। সন্ধ্যা নামলে বাগানের মধ্যে ঘুরে বেড়ায় ছোট ছোট হরিণ। এমন নিরিবিলি পরিবেশে শরতের ছুটি কাটাতে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন ইংল্যান্ডের নর্থ নরফোকের থর্নহ্যাম গ্রামের কাছে ড্রোভ অর্চার্ডস থেকে। এখানে ফলের বাগানের এক কোণে রয়েছে কাঠের তৈরি ছোট্ট কেবিন, যার নাম ‘দ্য রেড কেবিন’।
বাগানের মধ্যে দিয়ে কেবিনের দিকে যাওয়ার সময় সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে দেখা মিলতে পারে মুন্টজ্যাক প্রজাতির ছোট হরিণের। মাটিতে পড়ে থাকা আপেল খেতে ব্যস্ত থাকে তারা। নির্জন এই কেবিনে একসঙ্গে থাকতে পারেন সর্বোচ্চ চার জন। ব্রিটেনে তৈরি এই কেবিনটি এমন ভাবে সাজানো, যাতে প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানো যায় নির্ভার মনে।
শীতের সন্ধ্যায় কেবিনে পৌঁছে প্রথমেই জ্বালাতে হয় তিনটি আগুন। একটি ঘরের কাঠের চুল্লিতে, অন্য দু’টি বাইরের ডেকে থাকা সাউনা ও গরম জলের টবে। শুনতে পরিশ্রমের মনে হলেও, আগে থেকেই কাঠ সাজানো থাকে। শুধু আগুন ধরিয়ে দিলেই কাজ শুরু। ঘর দ্রুত গরম হয়ে উঠলেও সাউনা ও জলের টব গরম হতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে। অপেক্ষার ফাঁকে বাগানের দোকান থেকে কেনা স্থানীয় ফলের পানীয় নিয়ে কাটিয়ে দেওয়া যায় নিরিবিলি সময়।
সাউনা ব্যবহারের জন্য প্রথমে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছলেই শুরু করা যায়। পরে তা বাড়িয়ে ৭০ ডিগ্রি পর্যন্ত নেওয়া যায়। আর রাতের আকাশে তারা ফুটে উঠলে গরম জলের টবে বসে উপভোগ করা যায় চারপাশের নিস্তব্ধতা। কেবিনের চারদিকে উঁচু গাছ ছাড়া আর কেউ নেই। তাই ব্যক্তিগত পরিসরে ছুটি কাটানোর সুযোগ মেলে।
সকালে বড় কাচের জানলা দিয়ে ঘরে ঢোকে রোদ। ছোট্ট রান্নাঘরে কফি বানিয়ে ডেকে বসে পাখির ডাক শুনতে শুনতে সকাল শুরু করা যায়। জাপানি ও স্ক্যান্ডিনেভীয় নকশার প্রভাব রয়েছে কেবিনের সাজসজ্জায়। অতিরিক্ত আসবাব বা বাহুল্য নেই; বরং প্রকৃতিকেই এখানে প্রধান আকর্ষণ করে তোলা হয়েছে। আরামদায়ক বড় বিছানা, ছোট বাথরুম এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা মিলিয়ে অল্প সময়ের ছুটির জন্য জায়গাটি বেশ উপযোগী।
কেবিনগুলি কাঠ, প্লাইউড, কর্ক, উল ও হেম্পের মতো প্রাকৃতিক উপকরণ দিয়ে তৈরি। চাকার কাঠামোর উপর বসানো হওয়ায় মাটিতে কংক্রিটের ভিত তৈরি করতে হয় না। বিদ্যুতের জন্য ছাদে রয়েছে সৌর প্যানেল, আর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ব্যবহার করা হয় বিশেষ ধরনের শুষ্ক শৌচাগার। তবে কেবিনে জল আসে সাধারণ সরবরাহ ব্যবস্থা থেকেই।
প্রকৃতির মাঝে হাঁটাহাঁটি
এখানে বেড়াতে গেলে গাড়ি থাকা বাধ্যতামূলক নয়। নিকটতম রেলস্টেশন কিংস লিন। সেখান থেকে কোস্টলাইনার বাসে ড্রোভ অর্চার্ডসের সামনে নামা যায়। কেবিন থেকে পায়ে হেঁটেই পৌঁছে যাওয়া যায় থর্নহ্যাম সৈকত ও হোলম ডিউনস প্রকৃতি সংরক্ষণ এলাকায়। জলাভূমির উপর তৈরি হাঁটার পথ ও কাঠের সেতু পেরিয়ে যেতে হয় সেখানে।
আরও দীর্ঘ পথ হাঁটতে চাইলে যেতে পারেন আরএসপিবি টিচওয়েল মার্শের দিকে। সেখান থেকে বিস্তীর্ণ বালুকাবেলা ধরে ব্র্যানকাস্টার পর্যন্ত হাঁটার সুযোগ রয়েছে। তবে জোয়ার-ভাটার সময় খেয়াল রাখা জরুরি। কোথাও কোথাও ঠান্ডা জল পেরিয়ে যেতে হতে পারে।
ড্রোভ অর্চার্ডস এলাকাতেও ঘোরার মতো জায়গা রয়েছে। ফলের দোকানের পাশাপাশি আছে ঘর সাজানোর সামগ্রীর দোকান, পুরনো জিনিসপত্র ও ভিন্টেজ পোশাকের বিপণি, ওয়াইন বিক্রির দোকান, ক্যাফে, পিৎজ়ারিয়া এবং মাছ-চিপসের দোকান। কাছের থর্নহ্যাম গ্রামে হেঁটে পৌঁছতে সময় লাগে প্রায় ১৫ মিনিট। সেখানে ১৬ শতকের ‘লাইফবোট ইন’ নামের একটি সরাইখানায় স্থানীয় খাবার ও পানীয়ের স্বাদ নিতে পারেন পর্যটকেরা।
কৃষিজমির পাশে নতুন পর্যটন ভাবনা
‘দ্য রেড কেবিন’-এর প্রতিষ্ঠাতা ট্যালি রিক্সের লক্ষ্য, কৃষকদের আয়ের বিকল্প পথ তৈরি করতে সাহায্য করা। জমির মালিক ও কৃষকদের সঙ্গে আলোচনা করে এমন নিরিবিলি জায়গায় কেবিন তৈরি করা হচ্ছে। কেন্টের একটি ভেড়ার খামারে প্রথম কেবিনটি তৈরি হয়েছিল। পরে দক্ষিণ ও পূর্ব ইংল্যান্ডের বিভিন্ন খামার ও আঙুরের বাগানেও এই ধরনের কেবিন চালু হয়েছে। সাফোক ও ইস্ট সাসেক্সেও নতুন কেবিন খোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
ড্রোভ অর্চার্ডসে ফল নিজে পেড়ে নেওয়ার মৌসুমে পর্যটকেরা ১৪০ ধরনের আপেল, নাশপাতি, বরই, চেরি ও কুইন্স সংগ্রহ করতে পারেন। শরতের ফসল তোলার সেই সময় পেরিয়ে গেলেও স্থানীয় ফল দিয়ে তৈরি ঝলমলে পানীয়ের স্বাদ নেওয়া যায়।
এই কেবিনে এক রাতে থাকার খরচ শুরু ২২০ পাউন্ড থেকে। সর্বোচ্চ চার জন থাকতে পারেন। প্রকৃতির কাছাকাছি, নিরিবিলি পরিবেশে শরতের ছুটি কাটাতে চাইলে নর্থ নরফোকের এই ঠিকানা হতে পারে অন্য রকম অভিজ্ঞতা।