বিমানে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে হঠাৎ খেয়াল করলেন, বিমানটি যেন একই জায়গার চারপাশে বারবার ঘুরছে। গন্তব্যের দিকে না গিয়ে আকাশে চক্কর কাটছে কেন? আবার কিছুক্ষণ পর ঘোষণা এল, নির্ধারিত বিমানবন্দরে না নেমে অন্য একটি বিমানবন্দরে অবতরণ করবে। এমন ঘটনায় অনেক যাত্রীর মনেই আতঙ্ক তৈরি হয়। তবে মাঝ আকাশে ঘোরা বা অন্য বিমানবন্দরে নেমে যাওয়া সব সময় বিপদের লক্ষণ নয়। বরং বিমান চলাচলে এগুলি অনেক ক্ষেত্রেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
বিমান নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছে গেলেই যে সঙ্গে সঙ্গে অবতরণ করতে পারবে, এমন নয়। বিমানবন্দরের আশপাশের আবহাওয়া, রানওয়ের পরিস্থিতি, আকাশপথে অতিরিক্ত বিমান, যান্ত্রিক সমস্যা কিংবা অন্য কোনও জরুরি পরিস্থিতির কারণে অবতরণ সাময়িক ভাবে পিছিয়ে যেতে পারে। তখন এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের নির্দেশে বিমানকে নির্দিষ্ট উচ্চতায় একটি নির্ধারিত পথে চক্কর কাটতে বলা হয়। এই পদ্ধতিকে বলা হয় হোল্ডিং প্যাটার্ন।
খারাপ আবহাওয়াই বড় কারণ
বিমানকে অন্য বিমানবন্দরে পাঠানোর অন্যতম সাধারণ কারণ খারাপ আবহাওয়া। বিশেষ করে বজ্রঝড়, প্রবল বৃষ্টি, ঘন কুয়াশা, কম দৃশ্যমানতা বা শক্তিশালী পার্শ্ববায়ু থাকলে নির্ধারিত বিমানবন্দরে নিরাপদে নামা কঠিন হয়ে যেতে পারে।
বিমানবন্দরের কাছে বজ্রঝড় থাকলে বিমানকে কিছু সময় আকাশে অপেক্ষা করানো হতে পারে। আবহাওয়া দ্রুত স্বাভাবিক হলে বিমানটি আবার গন্তব্যের দিকে এগিয়ে গিয়ে অবতরণ করতে পারে। কিন্তু খারাপ আবহাওয়া দীর্ঘস্থায়ী হলে আকাশে অপেক্ষা করিয়ে রাখা নিরাপদ বা বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে। তখন বিমানকে অন্য কোনও উপযুক্ত বিমানবন্দরে পাঠানো হয়।
কেন মাঝ আকাশে চক্কর কাটে
ধরা যাক, একই সময়ে একাধিক বিমান একটি বিমানবন্দরে অবতরণের জন্য এগিয়ে এসেছে। কিন্তু রানওয়ে বা আকাশপথে সাময়িক ভাবে জায়গার সংকট তৈরি হয়েছে। সে ক্ষেত্রে সব বিমানকে একসঙ্গে নামানো সম্ভব নয়। তখন কিছু বিমানকে নির্দিষ্ট উচ্চতায় অপেক্ষা করতে বলা হয়।
এই অপেক্ষার সময় বিমানটি এলোমেলো ভাবে ঘোরে না। এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল নির্দিষ্ট জায়গা ও উচ্চতা ঠিক করে দেয়। বিমান সেই নির্ধারিত পথ অনুসরণ করে চক্কর কাটে। আবহাওয়া পরিস্থিতি বা বিমানবন্দরের অবতরণ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হলে বিমানকে নামার অনুমতি দেওয়া হয়।
তবে এই অপেক্ষা অনির্দিষ্ট সময় ধরে চলতে পারে না। বিমানের জ্বালানি পরিকল্পনায় নির্দিষ্ট গন্তব্যের পাশাপাশি বিকল্প বিমানবন্দরের কথাও বিবেচনায় রাখা হয়। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করলে নিরাপদে অন্য বিমানবন্দরে পৌঁছানোর মতো জ্বালানি নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
কখন অন্য বিমানবন্দরে চলে যায়
নির্ধারিত বিমানবন্দরে অবতরণ করা যদি অসম্ভব বা অনিরাপদ হয়ে পড়ে, তখন বিমানকে ডাইভার্ট করা হয়। অর্থাৎ গন্তব্য বদলে অন্য একটি বিমানবন্দরে নামানো হয়। বিমান চলাচলের নিয়মে এমন বিকল্প বিমানবন্দরকে ‘অল্টারনেট অ্যারোড্রোম’ বলা হয়। পরিস্থিতি অনুযায়ী টেক-অফের পরের বিকল্প, পথে জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের বিকল্প এবং গন্তব্যের বিকল্প বিমানবন্দর এমন বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা থাকতে পারে।
আবহাওয়া খারাপ হওয়া এর অন্যতম কারণ হলেও একমাত্র কারণ নয়। রানওয়ে সাময়িক ভাবে বন্ধ থাকা, বিমানবন্দরে অতিরিক্ত চাপ, এয়ার ট্রাফিকের সমস্যা বা বিমানের কোনও কারিগরি ত্রুটির কারণেও ডাইভারশন হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের বেসামরিক বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির দায়িত্বে থাকা সরকারি সংস্থা ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফএএ) তথ্য অনুযায়ী, উল্লেখযোগ্য আবহাওয়া বা অন্য পরিস্থিতির কারণে নির্ধারিত গন্তব্যে যাওয়া সম্ভব না হলে বিমানকে অন্য বিমানবন্দরে পাঠানো হতে পারে।
যান্ত্রিক সমস্যা হলেও কি অন্যত্র নামে
বিমানে কোনও প্রযুক্তিগত সমস্যা দেখা দিলে পাইলট ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি মূল্যায়ন করেন। সমস্যাটি যদি এমন হয় যে গন্তব্যে পৌঁছে অবতরণ করার চেয়ে কাছের কোনও উপযুক্ত বিমানবন্দরে নেমে পরীক্ষা বা মেরামত করাই নিরাপদ, সে ক্ষেত্রেও ডাইভারশন হতে পারে।
আবার কখনও বিমানে গুরুতর অসুস্থ যাত্রী থাকলেও কাছের উপযুক্ত বিমানবন্দরে অবতরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। কারণ আকাশে বিমানের প্রতিটি সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য থাকে যাত্রী ও ক্রুদের নিরাপত্তা।
অন্য বিমানবন্দরে নামা মানেই কি বিমান বিপদে পড়েছে
একেবারেই নয়। অনেক সময় বাইরে থেকে ঘটনাটি নাটকীয় মনে হলেও এটি আসলে সতর্কতামূলক সিদ্ধান্ত। খারাপ আবহাওয়ার মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে নির্ধারিত বিমানবন্দরে নামার পরিবর্তে নিরাপদ বিকল্প বেছে নেওয়াই বিমান চলাচলের নিয়মিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ।
তাই মাঝ আকাশে বিমানকে বারবার ঘুরতে দেখলে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। কখনও সেটি কেবল অবতরণের জন্য অপেক্ষা করছে, আবার কখনও পাইলট ও এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন নির্ধারিত বিমানবন্দরে যাওয়া নিরাপদ, নাকি কাছের কোনও বিকল্প বিমানবন্দরে নেমে যাওয়া ভালো। শেষ পর্যন্ত আকাশপথে এই চক্কর কাটা কিংবা গন্তব্য বদলের মূল উদ্দেশ্য একটাই, ঝুঁকি না নিয়ে নিরাপদে বিমান ও যাত্রীদের মাটিতে নামানো।