বিমানবন্দরে পৌঁছে জানা গেলো, নির্ধারিত সময়ে উড়ছে না বিমান। কখনও আবহাওয়া, কখনও কারিগরি ত্রুটি, আবার কখনও বিমানবন্দর বা এয়ার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সমস্যায় ফ্লাইট পিছিয়ে যেতে পারে। কয়েক ঘণ্টার এই দেরি অনেক সময় পুরো ভ্রমণ পরিকল্পনাই এলোমেলো করে দেয়। কিন্তু ফ্লাইট দেরি হলে যাত্রীকে সব পরিস্থিতিতেই নীরবে অপেক্ষা করতে হবে, বিষয়টি এমন নয়। কোন দেশে, কোন রুটে এবং কী কারণে ফ্লাইট দেরি হয়েছে, তার ওপর নির্ভর করে যাত্রীর বেশ কিছু অধিকার থাকতে পারে।
খাবার ও পানীয়ের সুবিধা: কিছু দেশের যাত্রী-সুরক্ষা আইনে দীর্ঘ সময় ফ্লাইট দেরি হলে বিমান সংস্থাকে যাত্রীদের জন্য খাবার ও পানীয়ের ব্যবস্থা করতে হয়। যুক্তরাজ্যের নিয়মে, ফ্লাইটের দূরত্ব অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় দেরি হলে যাত্রীরা খাবার ও পানীয় এবং যোগাযোগের সুযোগ পাওয়ার অধিকারী। রাতভর অপেক্ষা করতে হলে পরিস্থিতি অনুযায়ী হোটেল ও বিমানবন্দর থেকে যাতায়াতের ব্যবস্থাও করতে হয়।
তবে এই সুবিধা পাওয়ার নিয়ম সব দেশের ক্ষেত্রে এক নয়। তাই বিমান সংস্থার কর্মীদের কাছ থেকে প্রথমেই জেনে নেওয়া উচিত, দেরির ক্ষেত্রে কী ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে।
বেশি দেরি হলে টিকিটের টাকা ফেরত: ফ্লাইটের দেরি এতটাই বেশি হলে যে যাত্রী আর সেই বিমানে যেতে চান না, কিছু দেশের আইনে টিকিটের টাকা ফেরত পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। যেমন, যুক্তরাজ্যের নিয়মে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ফ্লাইট পাঁচ ঘণ্টা বা তার বেশি দেরি হলে যাত্রী ভ্রমণ না করে রিফান্ড চাইতে পারেন।
যুক্তরাষ্ট্রেও কোনও ফ্লাইট বাতিল বা ‘সিগনিফিক্যান্টলি ডিলেড’ হলে এবং যাত্রী বিকল্প ফ্লাইট বা ভ্রমণ ক্রেডিট গ্রহণ না করলে টিকিটের মূল্য ফেরত পাওয়ার অধিকার থাকতে পারে।
দেরির জন্য ক্ষতিপূরণ কি মিলবে: ফ্লাইট দেরি হলেই যে সব সময় আর্থিক ক্ষতিপূরণ পাওয়া যাবে, তা নয়। দেরির কারণ এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাজ্যের ইউকে২৬১ নিয়মে, যাত্রী চূড়ান্ত গন্তব্যে তিন ঘণ্টার বেশি দেরিতে পৌঁছালে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারেন। তবে চরম আবহাওয়া, বিমানবন্দরের বাইরের কর্মীদের ধর্মঘট, নিরাপত্তাজনিত সমস্যা বা কিছু ধরনের অনিবার্য পরিস্থিতিকে ‘এক্সট্রাঅর্ডিনারি সার্কামস্ট্যান্সেস’ হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ক্ষতিপূরণ না-ও মিলতে পারে।
নিজের পকেট থেকে খরচ করলে কী করবেন: ফ্লাইট দেরির কারণে খাবার, হোটেল বা যাতায়াতের জন্য নিজের টাকা খরচ করতে হলে সব রসিদ ও প্রমাণপত্র সংরক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাজ্যের সিভিল এভিয়েশন অথরিটি জানিয়েছে, বিমান সংস্থা প্রয়োজনীয় সহায়তা না দিলে যাত্রী যুক্তিসংগত খরচ নিজে বহন করে পরে তা ফেরত চাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। তবে বিলাসবহুল হোটেল বা অস্বাভাবিক বেশি দামের খাবারের খরচ সাধারণত গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে।
সংযোগকারী ফ্লাইট মিস হলে: একটি ফ্লাইট দেরি হয়ে পরের সংযোগকারী ফ্লাইটটি মিস হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। একই বুকিংয়ের আওতায় থাকা সংযোগকারী ফ্লাইট হলে কিছু দেশের যাত্রী-অধিকার আইনে নতুন ফ্লাইট, খাবার বা রাতযাপনের ব্যবস্থা পাওয়ার সুযোগ থাকে। যুক্তরাজ্যের নিয়মে একই বুকিংয়ের সংযোগকারী ফ্লাইট দেরির কারণে যাত্রী চূড়ান্ত গন্তব্যে তিন ঘণ্টার বেশি দেরিতে পৌঁছালে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ক্ষতিপূরণও দাবি করা যেতে পারে।
তবে আলাদা আলাদা টিকিটে ‘সেল্ফ-ট্রান্সফার’ করলে একই ধরনের আইনি সুরক্ষা সব সময় পাওয়া যায় না।
যাত্রীর কী করা উচিত: ফ্লাইট দেরি হলে প্রথমেই বিমান সংস্থার কাছ থেকে দেরির কারণ ও নতুন সম্ভাব্য সময় জেনে নিন। বিমানবন্দরের ডিসপ্লে, এসএমএস, ই-মেল বা এয়ারলাইনের অ্যাপের আপডেটও নিয়মিত দেখুন।
এর পাশাপাশি বোর্ডিং পাস ও টিকিটের কপি রেখে দিন। দেরির ঘোষণা বা বার্তার স্ক্রিনশট সংরক্ষণ করুন। খাবার, হোটেল বা যাতায়াতের জন্য খরচ হলে রসিদ রাখুন। বিমান সংস্থার কর্মীদের কাছে খাবার, হোটেল বা বিকল্প ফ্লাইটের সুবিধা সম্পর্কে জানতে চান। ক্ষতিপূরণ বা খরচ ফেরতের দাবি থাকলে বিমান সংস্থার নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে আবেদন করুন।
ক্ষতিপূরণ সাধারণত স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাত্রীর হাতে চলে আসে না, প্রযোজ্য হলে বিমান সংস্থার কাছে দাবি জানাতে হয়। যুক্তরাজ্যের সিভিল এভিয়েশন অথরিটিও যাত্রীদের প্রথমে সরাসরি বিমান সংস্থার কাছে দাবি জানানোর পরামর্শ দিয়েছে।
সব দেশের নিয়ম এক নয়: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ফ্লাইটের অধিকার নির্ধারণে শুধু দেরির সময় দেখলেই হবে না। ফ্লাইট কোথা থেকে ছাড়ছে, কোথায় যাচ্ছে, কোন বিমান সংস্থা পরিচালনা করছে এবং দেরির কারণ কী এসবকিছু বিবেচনায় আসে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্ষেত্রেও যাত্রীদের জন্য নির্দিষ্ট সুরক্ষা রয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিমানযাত্রীদের অধিকার আরও শক্তিশালী করার জন্য সংশোধিত নিয়ম অনুমোদন করেছে। তবে নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত বিদ্যমান ইইউ নিয়মই প্রযোজ্য থাকবে।
তাই ফ্লাইট দেরি হলে শুধু বিরক্ত হয়ে অপেক্ষা না করে নিজের আইনি অধিকার সম্পর্কে জানুন, প্রমাণপত্র সংরক্ষণ করুন এবং প্রয়োজন হলে বিমান সংস্থার কাছে লিখিতভাবে দাবি জানান। কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষা তখন অন্তত আর্থিক ক্ষতির বোঝা হয়ে নাও দাঁড়াতে পারে।