মেঘের ওপর দিয়ে ছুটছে বিমান, নিচে হাজার হাজার ফুট দূরে পৃথিবী। তবু যাত্রীরা অনায়াসে মোবাইল বা ল্যাপটপে ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন। মেসেজ পাঠানো, ই-মেইল করা, ওয়েবসাইট দেখা কিংবা কখনও ভিডিও স্ট্রিমিং সবই সম্ভব হচ্ছে বিমানের ওয়াই-ফাইয়ের মাধ্যমে। কিন্তু মাটির হাজার ফুট ওপরে থেকেও এই ইন্টারনেট সংযোগ আসে কীভাবে?
বিমানের ওয়াই-ফাই আসলে সাধারণ মোবাইল নেটওয়ার্কের মতো সরাসরি কোনও মোবাইল টাওয়ারের সঙ্গে যাত্রীর ফোনকে যুক্ত করে না। বিমানে ব্যবহৃত ইন-ফ্লাইট ব্রডব্যান্ডের প্রধান দুটি প্রযুক্তি হলো স্যাটেলাইটভিত্তিক সংযোগ এবং এয়ার-টু-গ্রাউন্ড (এটিজি) সংযোগ।
স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ইন্টারনেট
অনেক বিমানে ছাদের ওপর বিশেষ অ্যান্টেনা থাকে। এই অ্যান্টেনা স্যাটেলাইটের সঙ্গে যোগাযোগ করে। বিমানের ভেতরের ওয়াই-ফাই সিস্টেম যাত্রীর মোবাইল, ট্যাবলেট বা ল্যাপটপ থেকে পাওয়া ডেটা বিমানের যোগাযোগ ব্যবস্থায় পাঠায়। সেখান থেকে অ্যান্টেনার মাধ্যমে সংকেত যায় আকাশের স্যাটেলাইটে।
স্যাটেলাইট সেই সংকেত পৃথিবীর গ্রাউন্ড স্টেশনে পাঠায়। গ্রাউন্ড স্টেশন থেকে তা ইন্টারনেটের মূল নেটওয়ার্কে পৌঁছায়। বিপরীত দিক থেকে ওয়েবসাইট বা অন্য অনলাইন পরিষেবার ডেটাও একই ধরনের পথে বিমানে ফিরে আসে। অর্থাৎ যাত্রীর ফোন → বিমানের ওয়াই-ফাই ব্যবস্থা → অ্যান্টেনা → স্যাটেলাইট → গ্রাউন্ড নেটওয়ার্ক—এই পথেই তথ্য আদান-প্রদান হতে পারে।
মাটির টাওয়ার থেকেও আসতে পারে সংযোগ
সব ইন-ফ্লাইট ওয়াই-ফাই স্যাটেলাইটনির্ভর নয়। কিছু ব্যবস্থায় এয়ার-টু-গ্রাউন্ড নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হয়। এক্ষেত্রে মাটিতে থাকা বিশেষ নেটওয়ার্কের সঙ্গে বিমানের নিচের দিকে থাকা অ্যান্টেনা যোগাযোগ করে। সেই সংযোগ বিমানের ভেতরের ওয়াই-ফাই ব্যবস্থায় পৌঁছে যায় এবং যাত্রীরা ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারেন।
তবে এই প্রযুক্তির একটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। মাটির নেটওয়ার্কের আওতার বাইরে, বিশেষ করে সমুদ্রের ওপর দিয়ে দীর্ঘ সময় উড়লে, এ ধরনের সংযোগ সব জায়গায় কার্যকর নাও হতে পারে। সে কারণে দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে স্যাটেলাইটভিত্তিক প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
যাত্রীর ফোন সরাসরি স্যাটেলাইটে কথা বলে না
অনেকের ধারণা, বিমানে ওয়াই-ফাই চালু করলে ফোনটি বুঝি সরাসরি আকাশের স্যাটেলাইটের সঙ্গে যোগাযোগ করে। আসলে তা নয়। যাত্রীর ডিভাইস প্রথমে বিমানের ভেতরের ওয়াই-ফাই একসেস পয়েন্ট-এর সঙ্গে যুক্ত হয়। এরপর বিমানের নিজস্ব যোগাযোগ ব্যবস্থা সেই ডেটাকে উপযুক্ত সংযোগের মাধ্যমে বাইরের ইন্টারনেটে পাঠায়।
অর্থাৎ বিমানের ভেতরে আপনার ফোনের ওয়াই-ফাই সিগন্যাল মূলত বিমানেরই নেটওয়ার্কের সঙ্গে যোগাযোগ করছে, স্যাটেলাইট বা মাটির নেটওয়ার্কের সঙ্গে সরাসরি নয়।
তাহলে কখনও ওয়াই-ফাই ধীর হয়ে যায় কেন?
একটি বিমানে একই সময়ে অনেক যাত্রী ইন্টারনেট ব্যবহার করলে উপলব্ধ ব্যান্ডউইথ অনেক ডিভাইসের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। ফলে সংযোগ ধীর হতে পারে। পাশাপাশি বিমানের অবস্থান, ব্যবহৃত প্রযুক্তি, স্যাটেলাইটের সক্ষমতা, নেটওয়ার্কের চাপ এবং সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনের ইন্টারনেট পরিষেবার ওপরও গতি নির্ভর করে।
বিশেষ করে স্যাটেলাইটভিত্তিক সংযোগে ডেটাকে আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। ফলে মাটির ব্রডব্যান্ডের তুলনায় কখনও বেশি লেটেন্সি বা প্রতিক্রিয়া-সময় অনুভূত হতে পারে।
আকাশে ওয়াই-ফাই, পেছনে জটিল প্রযুক্তি
বিমানে বসে ওয়াই-ফাই ব্যবহার করা যাত্রীর কাছে হয়তো সাধারণ একটি সুবিধা। কিন্তু এর পেছনে কাজ করে বিমানের ভেতরের নেটওয়ার্ক, অ্যান্টেনা, রেডিও যোগাযোগ ব্যবস্থা, গ্রাউন্ড স্টেশন এবং অনেক ক্ষেত্রে স্যাটেলাইটের সমন্বিত অবকাঠামো।
আজকের বিমান ভ্রমণে তাই আকাশে ওয়াই-ফাই শুধু যাত্রীদের বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি বিমান যোগাযোগ প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনেরও একটি উদাহরণ। মাটিতে থাকা ইন্টারনেটকে আকাশে নিয়ে যাওয়ার এই প্রযুক্তিই কয়েক হাজার ফুট ওপরে বসেও পৃথিবীর অনলাইন জগতের সঙ্গে যাত্রীদের যুক্ত রাখছে।