ঘন সবুজ বন, খাড়া পাথুরে ঢাল, শ্যাওলায় ঢাকা গাছের কাণ্ড, গোলাপি আভা ছড়ানো শিলা আর নীল জলের শান্ত হ্রদ। দক্ষিণ সুইডেনের সোদেরওসেন ন্যাশনাল পার্ক যেন প্রকৃতির নিজ হাতে আঁকা এক বিশাল ছবি। তবে এই সৌন্দর্যের গল্প শুধু বন আর পাহাড়ের নয়। মানুষের ব্যবহারে একসময় বদলে যাওয়া একটি ভূদৃশ্য কীভাবে ধীরে ধীরে তার স্বাভাবিক রূপ ফিরে পেয়েছে, সোদেরওসেন তারও জীবন্ত উদাহরণ।
২০০১ সালে জাতীয় উদ্যান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত সোদেরওসেনের আয়তন ১ হাজার ৬০০ হেক্টরের বেশি। বিস্তীর্ণ সোদেরওসেন পাহাড়শ্রেণির অংশজুড়ে থাকা এই বন উত্তর ইউরোপের অন্যতম বড় সংরক্ষিত পত্রঝরা বনাঞ্চল। হাজার হাজার বছর ধরে ভূত্বকের সংঘর্ষ, শিলাস্তরে ফাটল, আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ ও বরফযুগের প্রভাবে এখানকার অনন্য ভূপ্রকৃতি তৈরি হয়েছে।
ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন থেকে গাড়িতে প্রায় দেড় ঘণ্টায় পৌঁছানো যায় এই জাতীয় উদ্যানে। গণপরিবহনেও যাওয়া সম্ভব। প্রবেশপথের ছোট্ট গ্রাম রোস্তোঙ্গা থেকে পর্যটকেরা প্রয়োজনীয় খাবার ও সামগ্রী সংগ্রহ করে পায়ে হেঁটে, সাইকেলে কিংবা ঘোড়ায় চড়ে অরণ্যের দিকে এগিয়ে যান। গ্রামটিতেও রয়েছে খাবার, লাইভ সংগীত ও শিল্পচর্চাকে ঘিরে প্রাণবন্ত পরিবেশ।
শতবর্ষী অতিথিশালায় রাত
সোদেরওসেনে প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার অভিজ্ঞতা পেতে পারেন ভিলা সোদেরওসেন-এ। হলুদ-সাদা কাঠের তৈরি এই অতিথিশালাটি ১৯০৪ সাল থেকে জাতীয় উদ্যানের প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে আছে। নতুন রেলপথ ধরে প্রকৃতির টানে আসা পর্যটকদের থাকার জন্যই একসময় এটি তৈরি হয়েছিল।
বর্তমান মালিক সেবাস্তিয়ান ও ওসা সেই পুরোনো ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। সেবাস্তিয়ানের মতে, বনের মধ্যে মানুষই সবচেয়ে বেশি শব্দ করে। তাই প্রকৃতিকে অনুভব করতে হলে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকা দরকার। আধ ঘণ্টা নীরবে বসে থাকলেই চারপাশের বনের নিজস্ব শব্দ ও প্রাণচাঞ্চল্য ধরা দিতে শুরু করে।
সন্ধ্যায় অবশ্য পরিবেশ বদলে যায়। রোস্তোঙ্গার স্টেশনেন-এর বাইরে লম্বা কাঠের টেবিলে অপরিচিত মানুষও একসঙ্গে বসে খাবার খান। খোলা দরজা দিয়ে ভেসে আসে লাইভ সংগীত, আগুনের পাশে গল্পে মেতে ওঠেন বড়রা, আর চারপাশে ছুটে বেড়ায় শিশুরা।
বনের গভীরে নীল জলের হ্রদ
পরদিন অরণ্যের গভীরে যাওয়া যায় ওডেনসিয়ন বা ওডিনস লেক দেখতে। প্রায় নিখুঁত গোলাকার এই হ্রদটি খাড়া, বিচগাছে ঢাকা ঢালে ঘেরা। ভূগর্ভস্থ ঝরনার পানি এসে হ্রদটিকে পূর্ণ করে। বনপথে প্রায় ১৫ মিনিট হাঁটার পর দেখা মেলে নীল জলের এই শান্ত জলাশয়ের।
লোককথায় কেউ কেউ হ্রদটিকে ‘তলহীন’ বলেও মনে করেন। উষ্ণ সময়ে এখানে সাঁতার কাটার অভিজ্ঞতাও নিতে পারেন পর্যটকেরা। চারপাশের সবুজের ফাঁক দিয়ে দেখা নীল আকাশের প্রতিফলন পানিতে ঢেউ তোলে। ঘাসফড়িংয়ের ডাক, গাছের ডালে মাকড়সার জাল, রঙিন পোকামাকড় আর নীল ফড়িং—সব মিলিয়ে হ্রদের চারপাশে তৈরি হয় বুনো প্রকৃতির এক অনন্য পরিবেশ।
মাটির নিচে লুকিয়ে ৬০০ বছরের ইতিহাস
আজকের ঘন সবুজ বন দেখে বোঝার উপায় নেই, কয়েক শতাব্দী আগে এখানকার চেহারা কেমন ছিল। কয়েক বছর আগে বিজ্ঞানীরা ওডেনসিয়ন হ্রদের তলদেশ থেকে পলির নমুনা সংগ্রহ করেন। তা বিশ্লেষণ করে গত প্রায় ৬০০ বছরের ভূমি ব্যবহারের ইতিহাস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়।
গবেষণায় দেখা যায়, ১৮ ও ১৯ শতকে সোদেরওসেনের মালভূমির বড় অংশ ছিল বনশূন্য। সেখানে ছিল খোলা তৃণভূমি বা হিথ। পশু চরানোর জমি তৈরি রাখতে ওই এলাকার উদ্ভিদ নিয়মিত আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হতো।
আজ সেই ভূদৃশ্য পুরোপুরি বদলে গেছে। সারি সারি বিচগাছ, শ্যাওলায় ঢাকা কাণ্ড, মাটির ওপর ছড়িয়ে থাকা শিকড় এবং ঘন সবুজে ভরা বন জানান দেয় প্রকৃতির দীর্ঘ পুনরুদ্ধারের গল্প।
বনের পড়ে থাকা মৃত গাছ ও শুকনো কাঠও সরিয়ে ফেলা হয় না। সেগুলো ধীরে ধীরে পচে গিয়ে পোকামাকড়, ছত্রাক ও নানা প্রাণীর জন্য আবাসস্থল তৈরি করে। এর ফলে বনভূমির জীববৈচিত্র্য আরও সমৃদ্ধ হয়।
রিফট ভ্যালি স্ক্যারালিড
প্রায় দুই ঘণ্টার হাঁটা শেষে পৌঁছানো যায় জাতীয় উদ্যানের দ্বিতীয় প্রবেশপথ স্ক্যারালিডে। এটি একটি গভীর রিফট ভ্যালি, যার চারপাশের খাড়া ভূপ্রকৃতি সোদেরওসেনের অন্যতম আকর্ষণ।
এখানে রয়েছে ন্যাটুরাম সোদেরওসেন—দর্শনার্থীদের তথ্যকেন্দ্র, যেখানে জাতীয় উদ্যানের প্রকৃতি, ভূতত্ত্ব ও ইতিহাস নিয়ে নানা তথ্য ও প্রদর্শনী রয়েছে। একই জায়গায় রয়েছে ক্যাফে ইতালিয়া। দু’টি স্থান থেকেই দেখা যায় মনোরম বাঁধ ও আশপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য।
তবে স্ক্যারালিডের বনের গল্প শুধু সৌন্দর্যের নয়। জাতীয় উদ্যান ঘোষণার পর সংরক্ষণ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এখানকার পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এমন নরওয়ে স্প্রুস গাছের অনেকগুলো কেটে ফেলা হয়। তার জায়গায় লাগানো হয় পত্রঝরা গাছ। লক্ষ্য ছিল স্থানীয় বনভূমির স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা।
নির্জন পথে ‘ডিয়ার লিপ’
আরও নিরিবিলি পরিবেশ উপভোগ করতে চাইলে প্রায় তিন ঘণ্টার হিওর্টস্প্রংসরুনদান বা ডিয়ার লিপ সার্কুলার ট্রেইল বেছে নেওয়া যায়। প্রাচীন একটি শিকারপদ্ধতির নাম থেকেই এই পথের নামকরণ।
হিথার ও বিলবেরির ঝোপ পেরিয়ে ট্রেইল এগিয়ে যায় পাহাড়ি ভূদৃশ্যের মধ্য দিয়ে। কোথাও দেখা যায় শক্ত গ্নাইস শিলা, যার গায়ে খনিজের কারণে গোলাপি আভা ফুটে ওঠে। পুরোনো বাঁকানো ওকগাছের ডাল থেকে কখনও শিকারি পাখি নিচে নেমে আসে।
ট্রেইলের কিছু অংশ বেশ খাড়া ও পাথুরে। কোথাও হাত-পা ব্যবহার করে এগোতে হয়, আবার কোথাও পিচ্ছিল ঢাল বেয়ে নামতে হয়। এই অংশটুকু পেরোতে গিয়ে মনে হতে পারে, বর্তমান সময় থেকে যেন কয়েক শতাব্দী পিছিয়ে কোনো প্রাচীন অরণ্যে প্রবেশ করেছেন।
এই পাহাড়ি ঢালের অনেক অংশ অতীতে মানুষের জমি পরিষ্কারের কর্মকাণ্ড থেকে রক্ষা পেয়েছিল। ফলে এখানে প্রাচীন বনভূমির বৈশিষ্ট্য এখনও টিকে আছে।
প্রকৃতি ফিরছে নিজের নিয়মে
সোদেরওসেনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো এখানেই। মানুষের ব্যবহারে একসময় যে ভূদৃশ্যের চরিত্র বদলে গিয়েছিল, সময়ের সঙ্গে সেখানে আবার ফিরে এসেছে বন। ফার্ন, লাইকেন, ছত্রাক, বীজ ও স্পোর ধীরে ধীরে নতুন করে জমি দখল করছে। পুরোনো পথ, পাথরের স্তূপ ও শুকনো পাথরের দেয়াল আবার মনে করিয়ে দেয় মানুষের অতীত উপস্থিতির কথাও।
তাই সোদেরওসেন শুধু হাইকিং, সাঁতার কিংবা বনভ্রমণের জায়গা নয়। প্রকৃতির সৌন্দর্যের পাশাপাশি মানুষের হস্তক্ষেপে ক্ষতিগ্রস্ত একটি ভূদৃশ্য কীভাবে সংরক্ষণ ও সময়ের হাত ধরে নতুন জীবন ফিরে পেতে পারে, দক্ষিণ সুইডেনের এই বন তার অসাধারণ উদাহরণ।
সূত্র: দ্যা গার্ডিয়ান