মানবতাবিরোধী অপরাধী বাবার হয়ে ছেলের লড়াই


নিজামী ও ছেলে নাজিব মোমেনএকাত্তরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে আদালতে আইনজীবীদের সঙ্গে থেকে মামলা লড়েছেন ব্যারিস্টার মো. নাজিবুর রহমান ওরফে নাজিব মোমেন। এমনকি বাবার পক্ষে ট্রাইব্যুনালে সাফাই সাক্ষ্যও দিয়েছেন তিনি।
২৪ অক্টোবর ২০১৩ নিজামীর পক্ষে চতুর্থ ও শেষ সাফাই সাক্ষী হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ তার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। নাজিব মোমেন তার সাক্ষ্যে বলেন, মতিউর রহমান নিজামীর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং তার লেখা অসংখ্য বই পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, তিনি আগাগোড়াই গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ইসলামি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় বিশ্বাসী।
ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর বা আপিল বিভাগের রায়ের পর তিনি কখনও গণমাধ্যমে কথা বলতে চাননি। সবসময়ই আসামিপক্ষের আইনজীবী প্যানেলের ওপর সে দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন। বাবার পক্ষে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে নাজিব প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন তার বাবার সঙ্গে মানবতাবিরোধী অপরাধ বা বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের কোনও সম্পর্ক নেই বরং, মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী প্রকাশিত বই, ম্যাগাজিন, পত্র-পত্রিকা, গল্প ও উপন্যাস পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তিনি দেখেছেন, ১৯৭১ সালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ ও বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের ঘটনার কোথাও মতিউর রহমান নিজামীর নাম নেই। মুক্তিযুদ্ধের পর এসব ঘটনায় প্রায় এক লাখেরও বেশি মামলা হয়েছিল তার কোনওটিতেই তার বাবার নাম ছিল না।
সাক্ষ্যে সাক্ষী নাজিব মোমেন তার বক্তব্যের সমর্থনে ট্রাইব্যুনালের কাছে দলিলপত্র উপস্থাপন করার চেষ্টা করেন।
সাফাই সাক্ষ্য উপস্থাপন নিয়ে নিজামী পুত্রকে তিরস্কারও করেন ট্রাইব্যুনাল। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতের আমীর মতিউর রহমান নিজামীর পক্ষে সাফাই সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয় পাবনার অ্যাডভোকেট কেএম হামিদুর রহমান জবানবন্দির মধ্য দিয়ে।
জেরার সময় প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আলী আদালতে অভিযোগ করে বলেন জবানবন্দি দেওয়া কে এম হামিদুরের নাম আসামির সাক্ষীর তালিকায় নেই। পরে উপস্থিত নিজামীর ছেলে ব্যারিস্টার নাজিব মোমেনের উদ্দেশে আদালত বলেন, আপনি একজন ব্যারিস্টার, আপনাকে অনেক দূর যেতে হবে। কিন্তু পেশার শুরুতে এটা কী করলেন? তখন নিজামীর ছেলে আদালতকে বলেন, এটা ক্ল্যাসিক্যাল মিসটেক, আমি বুঝতে পারিনি যে ট্রাইব্যুনালের কাছে দেওয়া পাঁচ জনের তালিকায় তানার নাম নেই।

আরও পড়ুন: এই নিজামীই সেই নিজামী

যদি সাধারণ স্বাধীনতাকামী বাঙালির ওপর দমন-পীড়ন চালাতে পাকিস্তানি বাহিনীকে সহযোগিতার জন্য গঠিত রাজাকার বাহিনী ও শান্তি কমিটিতেও নিজামীর ভূমিকার কথা উল্লেখ আছে ট্রাইব্যুনালের রায়ে। যেখানে বলা হয়েছে, একাত্তরে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি ও আল-বদর বাহিনীর প্রধান নিজামী নিজে বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় অংশগ্রহণ করেন। বুদ্ধিজীবীদের হত্যায় নিজামীর ভূমিকা ‘ডি-জুর ও ডি-ফ্যাক্টো’(প্রচ্ছন্ন ও সরাসরি) ছিল।

যদিও বাবার হয়ে সাফাই সাক্ষ্য দিতে গিয়ে নাজিব বলেছিলেন, বুদ্ধিজীবী হত্যায় ৪০টি মামলা হয়েছিল একটি মামলাতেও নিজামীর নাম নেই। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বুদ্ধিজীবী হত্যার ঘটনায় অনেকের ছবি ও নাম প্রকাশ হয়েছে, সেখানেও তার নাম ছিল না। এমনকি সর্বশেষ ১৯৯৭ সালে বুদ্ধিজীবী হত্যায় একটি মামলা হয়েছিল, সে মামলায়ও নিজামীর নাম ছিল না।

মতিউর রহমান নিজামীকে একজন খ্যাতিমান ইসলামিক রাজনীতিক এবং চিন্তাবিদ দাবি করে নাজিব মোমেন আরও বলেন, ১৯৮৬ সালে মতিউর রহমান নিজামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে ইসলামী আন্দোলনের একজন সম্ভাবনাময় নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি বলেন, গত সাড়ে তিন বছরের অনুসন্ধানে আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে পারি, মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে আনিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ মিথ্যা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনিও তার বাবার মতো মনে করেন, কেবল জামায়াতের আমির হওয়ার কারণেই তার বাবার বিরুদ্ধে স্বাধীনতার ৪২ বছর পরে নতুন করে এ অভিযোগ আনা হয়েছে। শুধু বাংলাদেশের বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে তিনি উল্লেখযোগ্য একজন বলে এসব অভিযোগ আনা হয়েছে।

/এমএনএইচ/