জঙ্গিদের আস্তানা বানানোর কৌশলের সঙ্গে পেরে উঠছে না পুলিশ

জঙ্গিরা কৌশল বদল করে বাসাভাড়া নিয়ে রাজধানীতে বারবার আস্তানা গড়ে তুললেও পুলিশসহ অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তা প্রতিরোধে কার্যত কোনও প্রতিরোধ সৃষ্টি করতে পারছে না। ভালো ব্যবহার ও অর্থ দিয়ে বাড়িওয়ালাদের ম্যানেজ করে তারা স্বল্প সময়ের জন্য বাসাভাড়া নেয়। তাদের তৎপরতা এমন গোপনীয়তার সঙ্গে চলে যে বাড়িওয়ালা ও প্রতিবেশী ভাড়াটেদের পক্ষেও তা বুঝে ওঠা সম্ভব হয় না। তাই, পুলিশের পক্ষ থেকে ভাড়াটিয়াদের তথ্য ফরম বিতরণসহ বিভিন্ন ধরনের প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও রাজধানীতে জঙ্গিদের বাড়িভাড়া নেওয়া বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না।

তাজ মঞ্জিল
পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট ও ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিবি) সূত্র জানিয়েছে, গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত নয়টি জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পেয়েছে পুলিশ।এসব আস্তানায় বসেই গুলশান হামলাসহ বড় বড় নাশকতার পরিকল্পনা করেছে জঙ্গিরা। আস্তানাগুলোও আবার এক রকমের হয় না। কোনওটিতে রাখা হয় বিস্ফোরক, কোনওটিতে চলে প্রশিক্ষণ আর কোনওটিতে জঙ্গিরা নিজেরা থাকে।
তবে পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, গত কিছুদিনের অব্যাহত তল্লাশির কারণে রাজধানীতে এখন আর কোনও জঙ্গি আস্তানা নাই। পুলিশি নজরদারি বাড়ানো, রাজধানীসহ এর আশেপাশের জেলাগুলোতে প্রতিদিনই ব্লক রেইড দেওয়া, বাড়িওয়ালাদের কাছ থেকে ভাড়াটিয়াদের তথ্য সংগ্রহ করা, বাড়িওয়ালাদের সচেতনতা বাড়ানো ইত্যাদি কারণে সন্দেহভাজন জঙ্গিরা এখন আর রাজধানীতে আস্তানা গড়ার সুযোগ পাচ্ছে না। তাদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
বাংলা ট্রিবিউনের অনুসন্ধানে জানা গেছে, জঙ্গিরা বাসাভাড়া নেওয়ার ক্ষেত্রে সবসময় কৌশল অবলম্বন করে থাকে। নিজেদের শিক্ষার্থী, মোয়াজ্জিন, গাড়িচালক ইত্যাদি পরিচয়ে বাসাভাড়া নেয় তারা। অনেকে সস্ত্রীক এসে বাসা ভাড়া নেয়। ফলে বাড়িওয়ালার পক্ষে সন্দেহ করার কোনও কারণই থাকে না। তবে প্রথমে একজন ভাড়া নিলেও পরবর্তীতে আত্মী পরিচয় দিয়ে ওই বাসায় অন্যরা উঠে যায়। প্রায় ক্ষেত্রে দেখা যায়, বাড়িওয়ালা যার কাছে ফ্ল্যাট ভাড়া দেয় তাকে আর খুঁজে পান না তিনি। কাজের উছিলায় কিংবা অন্য কোনও কারণ দেখিয়ে তার অনুপস্থিতিকে যৌক্তিক করে তোলে বাড়ির অন্যরা।
পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ভাড়া নিয়ে তারা কখনও বাড়িওয়ালার সঙ্গে ঝামেলা করে না। বাসাভাড়ার ক্ষেত্রে বাড়ির মালিক যে টাকা দাবি করে তা দিয়েই জঙ্গিরা বাসা ভাড়া নেয়। তারা এমন গোপনীয়তা মেনে চলে যে পাশের প্রতিবেশীরাও তাদের বিষয় কোনও তথ্য জানে না।
কল্যাণপুরের জঙ্গি আস্তানায় ৯ জঙ্গি নিহত হওয়ার পর ওই বাড়ির মালিক পুলিশকে জানিয়েছে, বাংলা কলেজের শিক্ষার্থী পরিচয়ে তারা বাসা ভাড়া নিয়েছিল। অন্যদিকে, একই সময় শেওড়াপাড়ার একটি বাড়িতে জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পাওয়া যায়। ওই বাড়ির মালিক পুলিশকে জানিয়েছেন, কয়েকজন তরুণ বাসাটি ভাড়া নিয়েছিল। তারা ভাড়া নেওয়ার সময় জানিয়েছিল, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার জন্য এসেছে। পরীক্ষা শেষে তারা চলে যাবে। এভাবেই তারা ওই দুটি বাসা ভাড়া নিয়েছিল।
অপরদিকে, গত ১৯ ফেব্রুয়ারি গাজীপুর থেকে এক জঙ্গিকে গ্রেফতারের পর রাজধানীর বাড্ডার সাঁতারকুলের ৫৭৭ নম্বর বাড়িতে (জিএম বাড়ি) জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পেয়ে অভিযান চালায় সিটিটিসি ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এসময় পুলিশের সঙ্গে গোলাগুলির ঘটনাও ঘটে। জঙ্গিদের চাপাতির কোপে এক পুলিশ সদস্য আহত হন। ওই আস্তানা থেকে গ্রেফতার হওয়া দুজনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মোহাম্মদপুরের নবোদয় হাউজিং এলাকায় আরও একটি জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পায় পুলিশ। মোহাম্মদপুরের ওই বাসাটি থেকে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়। এ বাসাটিও শিক্ষার্থী পরিচয়ে ভাড়া নিয়েছিল জঙ্গিরা। আর বাড্ডার বাসাটি তারা ভাড়া নেয় পোশাক শ্রমিক হিসেবে।পুলিশ তাদের গ্রেফতার করার আগ পর্যন্ত বাড়ির মালিক জানতেন না, তারা জঙ্গি।
অপরদিকে গত ৩ আগস্ট রাজধানীর রায়েরবাজার ভেড়িবাঁধ এলাকার সিকদার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পেছনের একটি বাড়ি থেকে নতুন জঙ্গি সংগঠন ‘আল আনসার’ এর সমন্বয়কারীসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। ওই বাড়িটিকে তারা জঙ্গি আস্তানা হিসেবে গড়ে তুলেছিল।
র‌্যাবের মুখপাত্র মুফতি মাহমুদ বলেন, ‘মসজিদের মোয়াজ্জিন পরিচয়ে বাসাভাড়া নিয়েছিল। এদের মধ্যে অনেকে গাড়ি ও রিকশাচালক। এটা তাদের ছদ্মবেশ। নতুন এই জঙ্গি সংগঠনটি আল-কায়দার ভাবাদর্শে বিশ্বাসী।তারা হরকাতুল জিহাদ থেকে এসে এই সংগঠনটি করার চেষ্টা করছে। তারা ভাবছে এই নামে জঙ্গি সংগঠন করলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে পারবে। তবে তারা তা পারেনি।’
গোয়েন্দারা জানান, প্রতিটি আস্তানায় জঙ্গিরা ওঠার কিছুদিনের মধ্যেই সন্দেহজনক আচরণের কারণে তাদের ব্যাপারে তথ্য পায় পুলিশ।কিছু আস্তানায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা গেছে, কিছু আস্তানায় তাদের পাওয়া যায়নি। জঙ্গিরা রাজধানীতে তখনই বাসাভাড়া নেয় যখন তারা কোনও নাশকতা বা হামলা চালাতে চায়। তারা নাশকতার পর আবার দ্রুত রাজধানী থেকে চলে যায়। হোসনি দালানে হামলার সময় জঙ্গিরা কামরাঙ্গীরচর এলাকায় অবস্থান নিয়েছিল। এরপর কেউ ঢাকার বাইরে থেকে এসে হামলায় অংশ নেয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার ও সিটিটিসি’র প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘বাড্ডার জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালানোর পর থেকে ৯টি রাজধানীতে জঙ্গি আস্তানা পাওয়া গেছে।এসব আস্তানায় জঙ্গিরা বিভিন্ন ধরনের পরিকল্পনা করত। তবে এগুলো ভেঙে দেওয়া হয়েছে।’


/এআরআর/টিএন/আপ-এমও