আবদুল কাহার আকন্দ বলেন, দেশে বর্তমানে যে জঙ্গি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চলছে, তার গোড়াপত্তন হয়েছে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মধ্যদিয়ে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর মেজর ডালিম রেডিওতে ঘোষণা দিতে গিয়ে পাকিস্তানের অনুকরণে বাংলাদেশ বেতারকে ‘রেডিও বাংলাদেশ’ ও ‘জয়বাংলা’ স্লোগানের পরিবর্তে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ উল্লেখ করেছে। দেশের স্বাধীনতাকে নস্যাৎ করে আবার পূর্ব পাকিস্তান বানাতেই পরিকল্পিতভাবে তারা এটা করেছে।
বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে আবদুল কাহার আকন্দ বলেন, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মধ্যদিয়ে তারা এ দেশে জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদের বীজ বপন করেছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা তদন্তের সময় কর্নেল ফারুকের বাড়ি থেকে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে কাগজপত্রসহ অনেক কিছু উদ্ধার করা হয়েছে। তদন্তে রোহিঙ্গা ও আরাকানি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গেও ফারুক, ডালিমসহ বঙ্গবন্ধুর খুনিদের যোগসূত্র পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালে যখন বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার সঙ্গে সঙ্গে কিন্তু মামলা হয়নি। ২২ বছর পর বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে ১৯৯৬ সালের ২ অক্টোবর বঙ্গবন্ধুর পিএ এএফএম মোহিতুল ইসলাম বাদী হয়ে ধানমণ্ডি থানায় বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা দায়ের করেন। পরদিন ৩ অক্টোবর মামলাটি তদন্তের জন্য সিআইডিতে স্থানান্তর করা হয়।
তদন্ত করতে গিয়ে দেশ বিদেশ থেকে অনেক হুমকি-ধামকির শিকার হতে হয়েছে উল্লেখ করে আবদুল কাহার আকন্দ বলেন, আমেরিকা থেকে বিভিন্ন নামে হুমকি-ধামকি দেওয়া হয়েছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়েই এ মামলার তদন্ত কাজ চালিয়েছি। হুমকির পরও তদন্তে পিছপা হইনি মানবিকতার বিষয়টি সামনে আসার কারণে। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু না হয় রাজনীতি করেছেন। সেজন্য তার শত্রু থাকতেই পারে। কিন্তু তার শিশুপুত্র রাসেল কী অপরাধ করেছে। নারী ও শিশুদের হত্যা করা হয়েছে। নারী ও শিশুদের হত্যা করা মানবতার দিক থেকে খুবই খারাপ দৃষ্টান্ত। যা মেনে নিতে পারিনি।
সিআইডি’র আবদুল কাহার আকন্দ বলেন, তদন্তের দায়িত্ব নেওয়ার পর আলামত সংগ্রহে দেশে-বিদেশে বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ করি। সেসব জায়গা থেকে আলামতগুলো খুঁজে বের করতে হয়েছে। যেসব আলামত হারিয়ে যাচ্ছিল সেগুলোকে পুনরুদ্ধার করি। যারা এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত তারা সেনাবাহিনীতে ছিল। সেখান থেকেও অনেক কিছু সংগ্রহ করতে হয়েছে। বিভিন্ন আলামত সংগ্রহের পর সেগুলোকে আবার মিলিয়ে দেখতে হয়েছে। দিন-রাত পরিশ্রম করে ১০০ দিনের মধ্যে এ মামলার তদন্ত শেষ করতে হয়েছে। ১৯৯৭ সালের ১৫ জানুয়ারি ২০ জনকে অভিযুক্ত করে মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়।
১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর নিম্ন আদালতের বিচারক কাজী গোলাম রসুল সাবেক ১৫ জন সেনা কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি ১২ খুনির ফাঁসির আদেশ বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। ওই রাতেই কারাগারে আটক থাকা পাঁচ খুনি কর্নেল (অব.) সৈয়দ ফারুক রহমান, কর্নেল (অব.) সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মহিউদ্দিন আহমদ (ল্যান্সার), মেজর (অব.) এ কে বজলুল হুদা এবং মেজর (অব.) এ কে এম মহিউদ্দিনকে (আর্টিলারি) ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। খুনিদের একজন আবদুল আজিজ পাশা ২০০১ সালের ২ জুন জিম্বাবুয়েতে মারা গেছে বলে জানা গেছে।
মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া অন্য ছয়জন হলেন, কর্নেল এস এইচ বি নূর চৌধুরী, লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ এম রাশেদ চৌধুরী, মেজর শরিফুল হক ডালিম, লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবদুর রশীদ, ক্যাপ্টেন আবদুল মাজেদ ও রিসালদার মোসলেহ উদ্দিন। তারা পাকিস্তান, দুবাই, আমেরিকা ও কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছে বলে জানা গেছে। তাদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলে রেডনোটিশও রয়েছে।
বঙ্গবন্ধু হত্যার ধারাবাহিকতায় তার কন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যেও প্রথম ১৯৮৯ সালের ১০ আগস্ট মধ্যরাতে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে হামলা করে। তারা একযোগে গুলি চালিয়ে ও বোমা ফাটিয়ে ‘কর্নেল ফারুক জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিয়ে চলে যায়। পরে বাড়ির নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্য হাবিলদার জহিরুল ইসলাম বাদী হয়ে ধানমণ্ডি থানায় মামলা করেন। যা এখনও বিচারাধীন রয়েছে।
আরও পড়তে পারেন: ১৫ আগস্ট যেভাবে সময় কাটে শেখ হাসিনার
/এপিএইচ/এমএনএইচ/