দেশে ২০১৫ সালে ৭৭৭টি ধর্ষণ, ১৯৭টি গণধর্ষণ, ৫৩টি ধর্ষণ/গণধর্ষণের পর হত্যা, ৯০টি ধর্ষণ চেষ্টা, ২৩৪টি যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেছে। ৩৬ শতাংশ ধর্ষণের ঘটনার জন্য দায়ী ধর্ষণের শিকার নারীর প্রতিবেশী। সম্প্রতি ‘বাংলাদেশে নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতন চিত্র: ২০১৫’ শীর্ষক এক সমীক্ষা প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ।
সমীক্ষার তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে ১৫টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা বিষয়ক প্রতিবেদন থেকে। এতে দেখা গেছে, ৭৭৭টি ধর্ষণের ঘটনার মধ্যে ৪১২টিতেই নির্যাতনের শিকার কন্যাশিশু (বয়স অনুর্ধ্ব ১৮)। যাদের মধ্যে ৩৪ শতাংশের বয়স ২-৯ বছর, ২৩ শতাংশের বয়স ১০-১৩ বছর। এ ধরনের সহিংসতা সবচেয়ে বেশি হচ্ছে গ্রাম ও মফস্বল অঞ্চলে। ৭৫ শতাংশ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে গ্রাম, ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের এই সমীক্ষায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে যায়, বেশিরভাগ ধর্ষণের জন্য দায়ী প্রতিবেশী। অন্তত ৩৬ শতাংশ ধর্ষণের ঘটনার জন্য দায়ী ধর্ষণের শিকার নারীর প্রতিবেশী। এ ধরনের ১৫ শতাংশ অপরাধ সংঘটিত হয়েছে চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও বখাটের দ্বারা। ৬ শতাংশ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের দ্বারা।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে—১১ শতাংশ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে প্রাত্যহিক জীবনে কাছের মানুষদের দ্বারা। তাদের মধ্যে আছে, নিকটাত্মীয়, স্কুলশিক্ষক, প্রাইভেট টিউটর, সহপাঠী, সহকর্মী, বন্ধু ও গৃহকর্তা। এছাড়া প্রেমিকের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭ শতাংশ।
ধর্ষণের বিচারের ক্ষেত্রে সমীক্ষায় উঠে এসেছে হতাশাজনক চিত্র। মাত্র ১২ শতাংশ ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা গেছে। ১৯ শতাংশ ধর্ষণের ঘটনায় কোনও প্রকারের মামলা হয়নি। ৫৯ শতাংশ ঘটনায় কেবল মামলাই হয়েছে। ধর্ষককে বিচারের মুখোমুখি করতে নাপারার প্রবণতা অপরাধীদের আরও সাহসী করে তুলছে বলে উল্লেখ করে সমীক্ষায় বলা হয়, ২০১৫ সালে গণধর্ষণের দায়ে অভিযুক্তদের মধ্যে ২ শতাংশ এর আগেও একই অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছে। তবে আশার বিষয় হচ্ছে ধর্ষণের বিরুদ্ধে সমাজিক সচেতনতা তৈরি হচ্ছে। ২০১৫ সালে ১২১টি ধর্ষণের ঘটনায় এলাকাবাসীর পক্ষ থেকেই বিচারের জোরালো দাবি উঠেছে। বিচারের দাবিতে এলাকাবাসী থানা ঘেরাও, ডিসির কাছে স্মরকলিপি দেওয়া, ধর্ষককে গণপিটুনি, ধর্ষকের চাকরিচ্যুতির মতো ঘটনা পর্যবেক্ষণ করা গেছে।
যদিও এখন পর্যন্ত বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ধর্ষকরা শক্তিশালী হওয়ায় মামলা ও আইনিনী ব্যবস্থা নিতে সাহস করেন না নির্যাতনের শিকার নারী বা তার পরিবারের সদস্যরা।
৮৮ পাতার সমীক্ষা প্রতিবেদনের শেষে সরকারের প্রতি ২৫টি সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়। যেখানে রয়েছে, নারী নির্যাতনবিরোধী প্রচলিত আইনের সংস্কার করে তাকে সময়োপযোগী করে তোলা ও সঠিক প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন, যৌন নিপীড়নরোধে পৃথক আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন। ২৪ ঘণ্টা হেল্পলাইন চালু করা। যেন নির্যাতনের শিকার নারী যেকোনও সময় অভিযোগ করতে পারেন। নারীর প্রতি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে—এমন পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করা, জাতীয় শিক্ষানীতিকে জেন্ডার সংবেদনশীল করা।
এমএমআর /এমএনএইচ/