বিদায় ২০১৬: জঙ্গিবাদের উত্থান-পতনের বছর

বিদায় ২০১৬বছরের শুরুতে নতুন আঙ্গিকে দেশে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটলেও বছরের শেষ দিকে পতনের মধ্য দিয়েই বিদায় নিচ্ছে ২০১৬সাল। বছরের শুরুতে টার্গেট কিলিংয়ের মাধ্যমে জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠলেও বছরের মাঝামাঝি ১ জুলাই হলি আর্টিজানে হামলার মধ্যদিয়ে সেটা চরম আকার ধারণ করে। তবে ওই ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান শুরু হলে জঙ্গিদের পতন ঘণ্টাও বেজে ওঠে।

গত বছরের (২০১৫) ২৮ সেপ্টেম্বর ইতালির নাগরিক তাভেল্লা সিজার ও ৩ অক্টোবর জাপানি নাগরিক হোসি কোনিও  হত্যাকাণ্ডের মধ্যদিয়ে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম ও নব্য জেএমবি’র উত্থান ঘটে। ২০১৬-এর শুরুর দিকে ২৫ এপ্রিল রাজধানীর কলাবাগানে ইউএসএইডের কর্মকর্তা ও মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সাবেক প্রটোকল কর্মকর্তা জুলহাজ মান্নান ও তার বন্ধু মাহবুব তনয়কে হত্যা করে জঙ্গিরা। এরপর জুনে নাটোরে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী ব্যবসায়ী সুনীল গোমেজ, ঝিনাইদহে হিন্দু পুরোহিত আনন্দ গোপাল গাঙ্গুলী ও পাবনার হেমায়েতপুরে শ্রী শ্রী ঠাকুর অনুকুল চন্দ্র সৎসঙ্গ আশ্রমের সেবক নিত্যরঞ্জন পাণ্ডেকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে জঙ্গিরা। পরে পুলিশ জঙ্গিদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান শুরু করে। যে অভিযানে দেশের বিভিন্নস্থানে পুলিশ ও র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে জেএমবি’র জঙ্গিসহ নয়জন নিহত হন।

বিশেষ অভিযান চলার সময়েই ১ জুলাই রাজধানীর হলি আর্টিজানে নারকীয় হত্যাকাণ্ড চালায় জঙ্গিরা। এতে দুই পুলিশ কর্মকর্তা ছাড়াও ২০ বিদেশিকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে। যে ঘটনা গোটা দেশবাসীকে স্তম্ভিত করে। এ ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জঙ্গিবাদবিরোধী অভিযানে জঙ্গিদের পতনের ঘণ্টাও বেজে ওঠে। এরপর জঙ্গিবিরোধী পুলিশের অভিযানে কল্যাণপুরে নব্য জেএমবি’র শীর্ষ পর্যায়ের নয়জন জঙ্গি নিহত হয়। এরপর নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় অভিযানে নিহত হয় নব্য জেএমবি’র প্রধান সমন্বয়ক ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডার নাগরিক তামিম আহমেদ চৌধুরীসহ তিনজন। এরপর মিরপুরের রূপনগরে অভিযানে নিহত হয় নব্য জেএমবি’র সামরিক কমান্ডার মেজর জাহিদুল ইসলাম। সেপ্টেম্বরের অভিযানে আজিমপুরে নিহত হয় নব্য জেএমবি’র গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও আশ্রয়দাতা হিসেবে পরিচিত তানভীর কাদেরী ওরফে আবদুল করিম। এরপর অক্টোবরে একদিনে পুলিশ ও র‌্যাবের জঙ্গিবাদবিরোধী অভিযানে ১১ জঙ্গি নিহত হয়।

সর্বশেষ আশকোনার অভিযানে তানভীর কাদেরীর কিশোর ছেলে আফিফ কাদেরী ওরফে আদর নিহত হয়। একই আস্তানায় এক শাকিরা নামের এক আত্মঘাতী নারী জঙ্গি বিস্ফোরণ ঘটিয়ে মৃত্যু বরণ করে। গুলশানের হলি আর্টিজানের হামলার পর জঙ্গিবিরোধী এসব অভিযানে ৩৫ জঙ্গি নিহত হয়। গ্রেফতার করা হয় আরও অনেককে। তবে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সামরিক কমান্ডার মেজর জিয়া ও নব্য জেএমবি’র আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ নেতা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে। তাদের গ্রেফতারসহ জঙ্গিবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানিয়েছেন কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম।

একই ইউনিটের কর্মকর্তারা মনে করেন, নতুন করে হামলা চালানোর সক্ষমতা এখন আর জঙ্গিদের নেই। তবে এমনটি মনে করে বসে থাকারও সুযোগ নেই। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স অব্যাহত রাখতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে জঙ্গিবাদ নির্মূল করতে হবে। কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের মাধ্যমে জঙ্গিবাদ নির্মূল সম্ভব নয়। নতুন বছরে জঙ্গিবাদ নির্মূলে বেশ কিছু পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান সংশ্লিষ্টরা।

এ দিকে শনিবার ধানমণ্ডিতে আওয়ামী লীগের এক সভায় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘নতুন বছরে আমাদের দু’টি কাজ করতে হবে। নির্বাচনের প্রস্তুতি ও সাম্প্রদায়িক উগ্রতা মোকাবিলা। নির্বাচনে যেমন জিততে হবে, তেমনি সাম্প্রদায়িক উগ্রতাকেও নিমূর্ল করতে হবে।’

/জেইউ/এমএনএইচ/

আরও পড়ুন:   আত্মঘাতী নারী জঙ্গিদের নিয়ে উদ্বিগ্ন গোয়েন্দারা