চাঞ্চল্যকর সাত খুনের প্রধান আসামি নূর হোসেনকে (ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত) ঘটনার পরপর টেলিফোনে দেশ ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী এমপি শামীম ওসমান। তিনি তখন টেলিফোনে যে ‘গৌরদা’র কথা উল্লেখ করেছিলেন, সেই গৌর’র আসল পরিচয় মিলেছে। তার নাম গৌর গোপাল সাহা, পিতা কালী চরণ সাহা (ঝালাকালি)। তার বাড়ি সাভার পৌরসভার কবিরাজপাড়ায়। তবে পুলিশের একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর থেকে গৌর কলকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছে।
এরপরই প্রশ্ন ওঠে কে এই গৌরদা? নানা সন্দেহ ও সম্ভাব্য নাম উঠে আসে। যদিও পুলিশের পক্ষ থেকে বিষয়টি তদন্ত করা হয়নি বলে জানান সাত খুন মামলায় সরকার পক্ষের আইনজীবী পাবলিক প্রসিকিউটর ওয়াজেদ আলী খোকন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যার যার সাক্ষ্য দেওয়ার কথা সবার সাক্ষীর ভিত্তিতে হত্যা, অপহরণ ও আলামত নষ্টের সহযোগিতায় জড়িত আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তিই দেওয়া হয়েছে। সাক্ষীরা যে সাক্ষ্য দিয়েছেন, তদন্তে যাকিছু বের করে আনা সম্ভব হয়েছে তার সবই আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। এধরনের কোনও বিষয় সেখানে আসেনি।’
কলকাতা নিবাসী গৌর গোপাল সাহার ঘনিষ্ঠ কয়েক ব্যক্তির সঙ্গে সম্প্রতি কথা হয় বাংলা ট্রিবিউন প্রতিবেদকের। ওই ব্যক্তিদের দাবি, সত্তরের দশকে শামীম ওসমানের বড় ভাই নাসিম ওসমান কলকাতায় গিয়ে গৌরের সংস্পর্শে আসেন। সেসময় থেকেই ওসমান পরিবারের সঙ্গে গৌরের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক।
গৌর গোপালের ছোট ভাই প্রাণ গোপাল সাহা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘গৌরের সঙ্গে তার দীর্ঘদিন দেখা হয়নি।’ তবে শামীম ওসমানের সঙ্গে তার ও গৌরের যোগাযোগ রয়েছে বলে জানান প্রাণ গোপাল।
সাভারের স্থানীয় অধিবাসীদের দাবি, গৌর ১৯৭২ সাল থেকে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের আগে পর্যন্ত সাভারে প্রবল প্রতাপের সঙ্গে নিজ বাহিনী তৈরি করে ক্ষমতার চর্চা করতো। সেসময় থেকেই সে নিজে কোনও মারামারি বা হত্যাকাণ্ড না ঘটালেও, অন্যদের দিয়ে নানা কর্মকাণ্ড করাতো । তাদের দাবি, এই গৌরের সঙ্গে যেহেতু নাসিম ওসমান ও তার পরিবারের যোগাযোগ ছিল, ফলে শামীম ওসমান টেলিফোনে নূর হোসেনকে যে ‘গৌরদা’র কথা বলেছিলেন, সে মূলত এই গৌরদা-ই।
সূত্র জানায়, ১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট গৌর গোপাল সাহা সাভার ছেড়ে চলে যায় ভারতে। প্রথমে সে কাদেরিয়া বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। তারপর যখন যে দল ক্ষমতায় এসেছে তাদের সঙ্গে নানা ‘ধান্দা’ করে সে তার বাণিজ্য চালিয়ে গেছে। কাদের সিদ্দিকীর কাদেরিয়া বাহিনীকে ভারত থেকে ধরে বেঁধে বাংলাদেশে পাঠানো হলে, গৌর সাহা কলকাতায় বিয়ে করে সেখানেই স্বাভাবিক জীবনযাপন শুরু করে । এরপর ১৯৯৬ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে একবার সাভারে আসলেও এলাকার মানুষের প্রতিরোধের কারণে আবারও সে ভারত ফিরে যায়।
গৌর গোপাল সাহা কেন এতদিন পর দেশে ফিরতে চাইলো, সে বিষয়ে সাভারবাসীর ধারণা, গৌর যে ধান্দা করে কলকাতায় চলতো সেই ব্যবসার অবস্থা ভালো না। তবে এখনও সে বাংলাদেশি বিভিন্ন অপরাধীদেরকে টাকার বিনিময়ে কলকাতায় আশ্রয় দিয়ে থাকে।
২০১৪ সালের ২৩ মে শামীম ওসমানের সঙ্গে নূর হোসেনের টেলিফোনে কথোপকথনের অডিও গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়। অডিওতে শোনা যায়, নূর হোসেন ফোন করার পর শামীম ওসমান বলেন, ‘খবরটা পৌঁছাই দিছিলাম, পাইছিলা?’ জবাবে নূর হোসেন বলে, ‘পাইছি, ভাই।’ শামীম ওসমান বলেন, ‘তুমি অতো চিন্তা করো না।’ নূর হোসেন এ সময় কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে, ‘ভাই, আমি লেখাপড়া করি নাই। আমার অনেক ভুল আছে। আপনি আমার বাপ লাগেন। আপনারে আমি অনেক ভালোবাসি, ভাই। আপনি আমারে একটু যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন।’ জবাবে শামীম ওসমান বলেন, ‘এখন আর কোনও সমস্যা হবে না’। এরপর ‘গৌরদা’ নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে নূর হোসেনকে দেখা করতে বলেন তিনি।
প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানে উঠে আসে, ৭৫ এর পর ভারত চলে গিয়ে গৌর কাদের সিদ্দিকীর দলে যোগ দেয়। তার গুরু সেসময়ের কলকাতা যুগান্তরের ডেপুটি এডিটর পরেশ সাহা। তার সঙ্গেও সম্পর্ক তৈরি হয়। সেসময় কলকাতায় বাহিনী গড়ে তোলেন কাদের সিদ্দিকী। প্রায় একই সময়ে সাভার পাড়গ্রামের ছেলে গিয়াসউদ্দিনও ফাঁসির দণ্ড নিয়ে ভারতে পালিয়ে গিয়ে যোগ দেয় গৌর সাহার সঙ্গে।
কাদেরিয়া বাহিনীতে থাকা এবং পরবর্তীতে বেরিয়ে আসা একটি সূত্র জানায়, নাসিম ওসমান গৌর ও পান্না নামের আরেকজনের মাধ্যমে কাদেরিয়া বাহিনীতে যোগ দিলে, তাদের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয় এবং শামীম ওসমানের সঙ্গেও যোগাযোগ স্থাপিত হয়।
সাভার পৌরসভার মধ্যপাড়া ও কবিরাজপাড়া এলাকায় কথা বলে জানা গেছে, আত্মীয়-স্বজন বলতে বর্তমানে গৌরের এক ভাইকেই চেনেন তারা। গৌরের বাড়ির জমিতে এখন ১৬ তলা ভবন নির্মাণের কাজ চলছে, যার ছয় তলা অব্দি কাজ শেষ হয়েছে। তবে বাড়ির তদারকি কে করছে, সে বিষয়ে কেউ কিছু জানেন না বলে দাবি স্থানীয়দের।
গত ১৬ জানুয়ারি সাত খুন মামলার রায়ে প্রধান আসামি নূর হোসেন, র্যা বের চাকুরিচ্যুত তিন কর্মকর্তা তারেক সাঈদ, আরিফ হোসেন ও এমএম রানাসহ ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ সাত জনকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়। এরপর ৩০ এপ্রিল ৬ জন ও ১ মে আরেকজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের পর নূর হোসেন পালিয়ে চলে যায় ভারতে। ২০১৫ সালের ১৪ জুন ভারতের কলকাতায় তিন সহযোগীসহ গ্রেফতার হয় সে। ওই বছরের ১২ নভেম্বর নূর হোসেনকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।
/এপিএইচ/আপ-এমও/