কে কাকে হত্যা করেছে?

লাশ উদ্ধাররাজধানীর রূপনগরে পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) আবদুস সাত্তার ও তার স্ত্রী সম্পা খাতুন গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনার রহস্য এখনও উদ্ঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। সম্পার স্বজনদের দাবি, ডিভোর্স দেওয়ার কারণে সম্পাকে গুলি করে হত্যার পর আত্মহত্যা করেছেন ছাত্তার। তবে রূপনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সৈয়দ শহিদ আলম রবিবার (৯ জুলাই) বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কে কার গুলিতে মারা গেছেন, তা এখনও নিশ্চিত হতে পারিনি আমরা।’
গত ৮ জুলাই সন্ধ্যায় রূপনগরের ২২ নম্বর সড়কের ৩২ নম্বর ভবনের ষষ্ঠ তলার বাসার দরজা ভেঙে বাড্ডা থানার এসআই আবদুস সাত্তার ও তার দ্বিতীয় স্ত্রী সম্পাকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়ার কিছুক্ষণ পর চিকিৎসকরা তাদের মৃত ঘোষণা করেন।
স্বজনদের দাবি, প্রায় এক বছর আগে প্রথম স্ত্রী ববিতা আক্তারের খালাতো বোন সম্পা খাতুনের সঙ্গে দ্বিতীয় বিয়ে হয় এসআই সাত্তারের। সম্পার বাবা সুকবর আলী বলেন, ‘গেলো রোজায় সাত্তারকে ডিভোর্স দেয় সম্পা। এ কারণেই আমার মেয়েকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।’
পারিবারিক কলহের কারণে এসআই সাত্তার প্রথমে সম্পাকে গুলি করার পর নিজের মাথায় গুলি চালিয়ে প্রাণ দিয়েছেন বলে পুলিশ কর্মকর্তারা ধারণা করছেন। তবে তদন্তের আগে এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলছেন না তারা।
এসআই সাত্তারের ভাই বাবলু রহমান রবিবার দুপুরে এ ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা করেন।

এদিকে মৃত ব্যক্তির নামে মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে আইনি জটিলতা রয়েছে বলে জানান ওসি সৈয়দ শহিদ আলম। তার ভাষ্য, “দু’জনকেই ঘরের দরজা ভেঙে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। তারা দু’জনই নিহত হয়েছেন। সেজন্য তদন্তের আগে কে কার গুলিতে মারা গেছেন সেটা এখনই বলা যাবে না। এজন্যই এ ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা নেওয়া হয়েছে।’

এসআই ছাত্তার ও তার স্ত্রী নিহতের ঘটনা প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিরপুর বিভাগের পল্লবী জোনের সিনিয়র সহকারী কমিশনার জাকির হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “এটি পারিবারিক হতাশা থেকে ঘটে থাকতে পারে। আমরা দরজা ভেঙে তাদের উদ্ধার করেছি। দু’জনই গুলিবিদ্ধ ছিলেন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়। তবে কে কাকে গুলি করেছে সে ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত নই।”

নিহত সম্পার বাবা সুকবর আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার মেয়ে সাত্তারের বাসায় থেকে চাকরি করতো। তারা গোপনে বিয়ে করেছিল। আমরা তখন কিছু জানতাম না। হঠাৎ গত বছর সম্পা ঢাকা থেকে চলে আসে। পরে জানতে পারি সাত্তার ও সে গোপনে বিয়ে করেছে।’

সুকবর আলী আরও বললেন, ‘সম্পা আমাকে জানিয়েছিল, সাত্তার তাকে জোরপূর্বক বিয়ে করেছে। মেয়েটা বাড়িতে চলে আসার পর সে বারবার নিয়ে যেতে চাইছিল। কিন্তু আমি দেইনি। শুরুতে আমার মেয়েও চায়নি। সাত্তার তার পরিবারকে দিয়েও আমাকে অনুরোধ করেছে। তাদের অনুরোধ রাখিনি। সে পাগলের মতো আচরণ করছিল। সে আমাকে বলেছিল, সম্পাকে তার বৌ করে ঢাকায় নিয়ে যেতে চায়। একসময় তার প্রথম স্ত্রী ববিতা আমাকে অনুরোধ করে বলে— খালু আপনার মেয়েকে দেন। আমরা দুই বোন একসঙ্গে থাকবো, ভালো থাকবো। নইলে দুটি জীবন নষ্ট হয়ে যাবে।”

ববিতার অনুরোধে মেয়েকে ছাত্তারের সঙ্গে যেতে অনুমতি দেন বলে বাংলা ট্রিবিউনকে জানান সম্পার বাবা। তার দাবি, ‘ভালো-মন্দ মিলিয়েই ওদের সংসার চলছিল। ঈদুল ফিতরের আগে আমার মেয়ে বাড়িতে চলে আসে। এরপর সাত্তারকে ডিভোর্স দেয়। ঈদও আমার বাড়িতেই কাটিয়েছে সে। ঈদের পর মেয়েটা আবার চাকরিতে যোগ দেয়। সেখান থেকে জোর করে বাসায় নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। ডিভোর্স দেওয়ার কারণেই সাত্তার আমার মেয়েকে মেরে ফেলেছে।’

সম্পার বড় বোন সবিতা খাতুন কথা বলেছেন বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে। তার ভাষ্য, ‘রোজার মাঝামাঝি সাত্তারকে ডিভোর্স দেয় সম্পা। এরপর থেকেই সে হুমকি দিয়ে আসছিল— যেখানেই থাকুক তাকে ধরে গুলি করে মারা হবে। ডিভোর্স দেওয়ার কারণেই তাকে মেরে ফেলেছে সাত্তার। বিয়ের পর আমার বোন পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি করতে চেয়েছিল। কিন্তু এগুলো তাকে করতে দেওয়া হতো না।’

ল্যাব টেকনিশিয়ান হিসেবে গত ১ জুলাই থেকে পল্লবীর আল-শাফি হাসপাতালে কাজ শুরু করেছিলেন সম্পা। গত ৭ জুলাই সন্ধ্যায় হাসপাতাল থেকে অনেকটা জোর করে তাকে মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে যান এসআই সাত্তার। এতে ভয় পেয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পল্লবী থানায় খবর দিয়েছিল। তবে হাসপাতালে পুলিশ যাওয়ার আগেই সম্পাকে নিয়ে সাত্তার বাসায় চলে যান বলে জানান ডিএমপির মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনার মাসুদ আহমেদ।

রবিবার আল-শাফি হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সম্পা ১ জুলাই চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। হাসপাতালটির মালিক অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন ড. মো. ফজলুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শুক্রবার সম্পার সাপ্তাহিক ছুটি থাকলেও তিনি হাসপাতালে এসেছিলেন। এরপর সন্ধ্যা ৭টার দিকে তার স্বামী এসে তাকে নিয়ে যান।’

অবসরপ্রাপ্ত এই ক্যাপ্টেন সঙ্গে যোগ করেছেন, ‘সম্পা এই হাসপাতালেই বছরখানেক আগে ৬ থেকে ৭ মাস কাজ করেন। পরে চাকরি ছেড়ে চলে যান। এরপর আবার চাকরির জন্য আসেন। পূর্বপরিচিত ও ভালো স্বভাবের মেয়ে হওয়ায় তাকে আবারও চাকরি দেওয়া হয় আমাদের এখানে।’

সাত্তার ও তার প্রথম স্ত্রী ববিতা আক্তারের সংসারে আছে দুই ছেলে। ববিতা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘আমার সম্মতিতেই সাত্তারের দ্বিতীয় বিয়ে হয়েছিল। আমাদের যাবতীয় খরচও বহন করতেন তিনি। আমাদের মধ্যে কোনও ঝামেলাও ছিল না।’

সবশেষ স্বামীর সঙ্গে কখন কথা হয়েছে জানতে চাইলে ববিতা বলেন, ‘শনিবার দুপুরে আমার বাসায় এসেছিলেন সাত্তার। দুপুরের খাবার খেয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যান তিনি। কোথায় যাচ্ছেন সেটা বলে যাননি।’

/জেইউ/এএম/জেএইচ/