মোটা টাকার বিনিময়ে বাহরাইনে গিয়ে প্রতারিত, ফিরছেন নিঃস্ব হয়ে

প্রতারণার শিকার ব্যক্তি ও তাদের স্বজনদের বিভিন্ন থানায় দায়ের করা জিডিগত বছরের আগস্টে বাহরাইন গিয়েছিলেন নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের আকবর হোসেন রনি। এ জন্য জমিজমা বিক্রি আর ধারদেনা করে এলাকার বাহার ও কামাল নামের দুই ব্যক্তির হাতে তুলে দিয়েছিলেন পাঁচ লাখ ৮০ হাজার টাকা। যাওয়ার আগে বাহার ও কামাল জানিয়েছিল বাহরাইনে তার মাসে ৫০ হাজার টাকার চাকরির ব্যবস্থা হবে। থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা শুরুতে তারাই করবে,পরে রনিকে নিজের মতো ব্যবস্থা করে নিতে হবে। কিন্তু গিয়ে দেখেন ভিন্ন পরিস্থিতি। সেখানে একটি ঘরে তাকে আটকে রাখা হয়। পাসপোর্ট রেখে দেয় বাহার। দুই মাসের মধ্যেই রনি বুঝতে পারেন প্রতারিত হয়েছেন তিনি। এরপর ফিরে আসার জন্য পাসপোর্ট চেয়েও বাহারের কাছ থেকে দুর্ব্যবহার ছাড়া কিছু মেলেনি। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় পাসপোর্ট নিয়ে ওই বছরের অক্টোবরেই দেশে ফিরে আসেন রনি। দেশে এসে বাহারসহ তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে বেগমগঞ্জ থানায় অভিযোগ করেন তিনি। তবে এ বিষয়ে কিছুই জানে না বলে দাবি করছে থানা পুলিশ।
কেবল রনি নয়, বেগমগঞ্জ থেকে কমপক্ষে ১৫ জন বাহরাইনে গিয়ে প্রতারিত হয়েছেন। কেউ ফিরে আসতে পেরেছেন, কেউ কেউ এখনও সেখান থেকে স্বজনদের ফোন করে কান্নাকাটি করছেন ফিরে আসার জন্য। সঙ্গে পাসপোর্ট নেই, তার ওপর অবৈধ বলে যদি জেলে ঢোকায়- সেই ভয়ে কোথাও যেতেও পারেন না তারা। এ বিষয়ে জানতে বাংলা ট্রিবিউনের পক্ষ থেকে বাহরাইনে বাংলাদেশ দূতাবাসে বারবার টেলিফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পারা যায়নি।
মতিঝিল থানায় দায়ের করা জিডি কপিআর অভিযোগ দায়েরের বিষয়ে বেগমগঞ্জের পুলিশ বলছে, ভুক্তভোগীরা জিডি করে থাকলে সেগুলো দেখে বলতে হবে। আরও অনেকে সেখানে আটকে আছে জানানো হলে বলা হয়, অভিযোগ বেশ আগের, অভিযোগ দায়েরকারীর সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি দেখা হবে।
বাহরাইন থেকে ফিরে আসা এবং এখনও সেখানে আটকে থাকা সাতজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেগমগঞ্জের অন্তত ত্রিশ যুবকের কাছ থেকে বাহরাইনে নেওয়ার কথা বলে প্রায় ৬ লাখ টাকা করে নিয়েছে একটি চক্র। এই যুবকদের বাহরাইনে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা মাসিক বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখানো হয়েছিল। প্রতারিত এই যুবকরা জানান, ওই দেশে পৌঁছানোর পর প্রথমেই প্রত্যেকের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়। এরপর অন্য দেশের লোকদের সঙ্গে থাকার ব্যবস্থা এবং মাসের পর মাস চাকরি ছাড়া প্রায় আটকাবস্থায় বসবাস করতে বাধ্য করা হয়। চাকরির কথা জানতে চাইলে নানা ভয়ভীতি দেখিয়ে আরও টাকা চাওয়া হয়। দেশে ফিরে আসতে চাইলে উল্টো চাঁদাবাজির মামলা দেওয়া হবে বলে ভয় দেখানো হয়।
জিডিতে উঠে এসেছে প্রতারিত হওয়ার কথাচাকরি না পেয়ে ফেরত আসা সোলায়মান বলেন, ‘বাহারের মাধ্যমে বাহরাইন গিয়েছিলাম। সেখানে আমাদের তুরস্কে পাঠিয়ে দেবে বলে ভয় দেখানো হতো। আমাদের পাসপোর্ট আর যাতায়াত ও চাকরির জন্য খরচ লাগবে জানিয়ে দেশে ভাই ও বাবার কাছ থেকে আরও টাকা নেয় বাহার। আর বাহরাইনে কামাল বাকি কাজগুলো করতো। আমরা দূতাবাসে যোগাযোগ করতে চেয়েছি কিন্তু কিছু চিনি না, ভাষা জানি না। আমাদের কে নিয়ে যাবে। তারওপর কাগজপত্র ঠিক আছে কিনা সেটা দেখে দেওয়ারও কেউ নেই।’ সোলায়মান বলেন, ‘আমাদের শুরুতে একটা ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল। তারপর দেখি মাস চলে যায় চাকরির খবর নেই। তিন বেলা খাওয়াও নেই। বিদেশে গিয়ে এ রকম পরিস্থিতিতে পড়তে হবে বুঝিনি।’ তিনি বলেন, ‘দেশে ফিরে আসতে চাওয়ায় তারা আমাদের ‘বাহারের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ নেই’- একথা স্ট্যাম্পে লিখে দিতে বলেছিল। তা লিখতে না চাওয়ায় তখন আবারও লাখখানেক টাকা দাবি করে তারা।’ ভুক্তভোগী এই যুবক বলেন, ‘এই এক চাকরির জন্য জমি-ঘর-সংসার সব শেষ করে ফেলেছি আমরা। দেশে ফিরে থানায় অভিযোগ করে আজও কোনও ফল পাইনি।’
শুধু বিদেশ ভূঁইয়ে এক অনিশ্চিত জীবন নয়, দেশে বিপুল ঋণের বোঝাও যন্ত্রণায় পোড়াচ্ছে প্রতারিত এই মানুষগুলোকে। তেমনই একজন বেল্লাল। তার স্ত্রী শাহীন আক্তার গত মার্চ মাসে বাহার, কামাল ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বেগমগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। এতে কিভাবে তার স্বামী বেল্লাল ও ভাই হুমায়ুন কবিরকে টাকার বিনিময়ে বাহরাইনে চাকরি নিশ্চিত বলে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে তা তুলে ধরেছেন তিনি। শাহীন আক্তার তার স্বামীর ফিরে আসার অপেক্ষায় আছেন। কিন্তু ফিরে এসে ঋণের বোঝা নিয়ে কিভাবে দিন কাটাবেন সেই শঙ্কায় রয়েছেন বেল্লাল। তারপরও পাসপোর্টটা পেলেই তিনি নরক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি চাইবেন বলে জানান।
বেগমগঞ্জ থানায় দায়ের করা আরেক ভুক্তভোগীর জিডির কপিএকটি এলাকা থেকে এতগুলো মানুষ একই চক্রের মাধ্যমে প্রতারিত হলো অথচ অভিযোগ পেয়েও কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি-এমন প্রশ্নে বেগমগঞ্জ থানার ওসি সাজিদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘উনাদের বিষয়টি আমার জানা ছিল না।’ গত অক্টোবর থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত একই বিষয়ে এত জিডি কেন নজরে আসবে না জানতে চাইলে তিনি কোনও উত্তর দেননি। তিনি অভিযোগকারীদের থানায় যোগাযোগ করতে বলেন এবং বিষয়টি দেখবেন বলে জানান।
প্রবাসী শ্রমিক ও অভিবাসন নিয়ে গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) প্রধান তাসনিম সিদ্দিকী মনে করেন বর্তমান সিস্টেম প্রতারণার বৈধতা দিয়ে রেখেছে। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘২০১৩ সালের অভিবাসনের যে আইন, সেখানে দালাল প্রতিরোধে কিছু বলা নেই। অথচ এ ধরনের প্রতারণা দালালের মাধ্যমেই ঘটছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘স্থানীয়ভাবে আরবিট্রেশনের মাধ্যমে টাকা ফেরত দেওয়ার উদাহরণ আছে কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দালালের চিহ্ন পাওয়া যায় না।’

আরও পড়ুন-

জাতীয় বধির সংস্থায় প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত হাইকোর্টে স্থগিত

ব্যাংক কর্মকর্তা হত্যা মামলায় দণ্ড কমলো ফাঁসির আসামির

ধর্ষণের পর গলাটিপে হত্যা করা হয় ছোট্ট শিশু তানহাকে


/ইউআই/এএম/