জানতে চাইলে পুলিশের খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি দিদার আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সিটিটিসি, পুলিশ সদর দফতরসহ আমরা মধ্যরাত থেকে ওই বাসাটি ঘিরে রাখি। সকালে তাদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানাই। বিকালে খাদিজা তার তিন সন্তানসহ পুলিশের কাছে আত্মসমপর্ণ করে।’
ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘তথ্য পেয়েছিলাম যশোরের ঘোপ নোয়াপাড়া এলাকার চারতলা একটি ভবনের দ্বিতীয় তলায় স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকতো হাদীসুর রহমান সাগর। এই তথ্যের ভিত্তিতে মধ্যরাতে ওই বাসাটি ঘেরাও করা হয়। সকালে ওই ভবনের ‘জঙ্গি আস্তানা’র পাশের ফ্ল্যাটগুলো থেকে পাঁচটি পরিবারকে নিরাপদে বের করে আনা হয়। ঢাকা থেকে সোয়াটের একটি দল এই অভিযানে যোগ দেয়। ‘জঙ্গি আস্তানা’য় থাকা সবাইকে আত্মসমর্পণের জন্য বার বার আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু প্রথম দিকে ভেতর থেকে কোনও সাড়া মিলছিল না।’
অভিযানে অংশ নেওয়া সিটিটিসির বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘খাদিজার সঙ্গে নিরাপদ দূরুত্বে থেকে আলোচনা করি। একপর্যায়ে বুঝতে পারি, ভেতরে মূল টার্গেট হাদীসুর রহমান সাগর নেই। তখন নারীরা যেন ধ্বংসাত্মক কোনও ঘটনা ঘটাতে না পারে, সে চেষ্টা শুরু করি। এর আগে ভোরেই আমরা খাদিজার বাবা-মাকে পাবনার বাড়ি থেকে যশোরে নিয়ে আসি। আলোচনার এক পর্যায়ে খাদিজা সুইসাইডাল ভেস্ট খুলে আত্মসমপর্ণ করতে রাজি হয়। আরও নিশ্চিত হতে বিকেল ৩টার দিকে খাদিজার বাবাকে সামনে নিয়ে যাই। বেলা সাড়ে ৩ টার দিকে তিন সন্তান নিয়ে বের হয়ে আসে খাদিজা। তাদের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।’
বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘খাদিজার আত্মসমর্পণের পর জঙ্গি আস্তানায় তিনটি শক্তিশালী বিস্ফোরক ভেস্ট দেখতে পাই। যেগুলো পরে নিষ্ক্রিয় করা হয়। শক্তিশালী ভেস্ট হওয়ার কারণে নিষ্ক্রিয় করার সময় জঙ্গি আস্তানার ভেতরের একটি কক্ষের মেঝেতে বড় গর্ত হয়ে যায়। এছাড়া ওই আস্তানা থেকে তিনটি ম্যাপ, একটি কম্পিউটার ও কিছু কাগজপত্র পাওয়া গেছে। যেগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে।’
একবছর ধরে ওই বাসায় সাগর
গুলশান হামলার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা, বিশেষ করে সিটিটিসির কর্মকর্তারা হন্যে হয়ে হাদীসুর রহমান সাগরকে খুঁজলেও একবছর ধরে সে যশোরের এই বাসায় আস্তানা গেড়ে অবস্থান করে আসছিল। বাড়িওয়ালা ও তার স্ত্রী খাদিজাকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে সিটিটিসির একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘‘মশিয়ার রহমান নামে বাসাটি ভাড়া নিলেও সে বাড়ির মালিককে জাতীয় পরিচয়পত্রের কোনও কপি দেয়নি। বাড়িওয়ালা জাতীয় পরিচয়পত্র চাইলে ‘দিচ্ছি-দেব’ বলে সময় পার করতো। হারবাল কোম্পানিতে চাকরির অজুহাতে মাঝে মধ্যেই তিন-চার দিনের জন্য বাসা থেকে বেরিয়ে যেতো বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে খাদিজা। জিজ্ঞাসাবাদে খাদিজা জানায়, তারা এর আগে কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহে থাকতো। গত ২-৩ বছর ধরে বাবার পরিবারের সঙ্গে তার কোনও যোগাযোগ ছিল না। বাসায় কোনও মোবাইল ফোন ব্যবহার করতো না। এমনকি প্রতিবেশী কারও সঙ্গে মেশাও নিষেধ ছিল তার।’’
পরিকল্পনা ছিল বড় নাশকতার
জঙ্গি প্রতিরোধ নিয়ে কাজ করে আসা সিটিটিসির কর্মকর্তারা বলছেন, যে কয়জন শীর্ষ জঙ্গি এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে, তাদের অন্যতম এই সাগর। নব্য জেএমবির শীর্ষ এই নেতা নতুন করে দলকে সংগঠিত করার পাশাপাশি বড় নাশকতার পরিকল্পনা করছিল বলে তাদের কাছে তথ্য ছিল। এ কারণে তাকে ধরতে একাধিক স্থানে অভিযানও চালানো হয়। কিন্তু সাগরের আস্তানার নির্দিষ্ট কোনও ঠিকানা পাওয়া যাচ্ছিল না।
অভিযানে অংশ নেওয়া সিটিটিসির একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘সাগর পালিয়ে গেলেও তার আস্তানা থেকে তিনটি বিস্ফোরক ভেস্ট (পরে নিষ্ক্রিয় করা হয়), কিছু নথিপত্র ও তিনটি মানচিত্র উদ্ধার করা হয়েছে।’
প্রাথমিক পর্যালোচনায় সিটিটিসির কর্মকর্তারা মনে করছেন, সাগর বড় হামলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। উদ্ধার হওয়া কম্পিউটার ও নথিপত্র পর্যালোচনা করলে আরও অনেক তথ্য পাওয়া যাবে।’
কে এই সাগর?
যাকে ধরতে যশোরের এই অভিযান সেই হাদীসুর রহমান সাগর আসলে কে? তার প্রসঙ্গে সিটিটিসির কর্মকর্তারা বলছেন, আনুমানিক ৩৬ বছর বয়সী সাগর পুরানো জেএমবির একজন সক্রিয় সদস্য। গ্রামের বাড়ি জয়পুরহাট সদরে। তার বাবার নাম হারুন উর রশীদ। তিনি এলাকায় একটি ফার্মেসি চালান। সিটিটিসির একটি গোয়েন্দা নথিতে বলা হয়েছে, সাগর পুরনো জেএমবি থেকে নব্য জেএমবি থেকে আসার পর ভারত থেকে অস্ত্র-বিস্ফোরক আনার নতুন রুট তৈরি করে। প্রথম থেকেই সে যশোর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহল এলাকার দায়িত্বশীল হিসেবে করতো।
সিটিটিসির অতিরিক্ত উপ-কমিশনার আহমেদুল ইসলাম বলেন, ‘নব্য জেএমবি নেতা মামুনুর রশীদ রিপন, সুলতান মাস্টার, আরিফ ওরফে মামু, সোহেল মাহফুজসহ জেএমবির যেই অংশটি নব্য জেএমবি তৈরি করেছে তাদের সঙ্গেই কাজ করতো সাগর। ২০১২-১৩ সালে সে সহযোগীদের সঙ্গে নব্য জেএমবিতে যোগ দেয়। বোমা তৈরিতে দক্ষ এই সাগরের প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে অস্ত্র ও বিস্ফোরক আনার রুটগুলো চেনা জানা ছিল।
সিটিটিসি সূত্র জানায়, ভারতের অংশে রবিউল নামে এক জঙ্গির সঙ্গে সমন্বয় করে সে অস্ত্র-বিস্ফোরক আনা-নেওয়া করতো। এছাড়া সাগরের মোটিভেশনাল দক্ষতা ছিল অনেক বেশি। মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাস হলেও সে সহজেই সাধারণ তরুণদের জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করতে পারতো। নারায়ণগঞ্জে নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতা তামিম চৌধুরীর সঙ্গে ফজলে রাব্বী নামে যে যুবক নিহত হয়, সে এই সাগরের হাত ধরেই নব্য জেএমবিতে জড়িত হয়েছিল। এছাড়া অভি, সজীব, টগরসহ দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চল এলাকা থেকে অনেককেই জঙ্গিবাদে জড়িত করে সে।