প্রধান বিচারপতির বক্তব্য নিয়ে আইনজীবী সমিতির পাল্টাপাল্টি সম্মেলন

ছুটি নিয়ে বিদেশ গমনের যাত্রাকালে গতকাল গণমাধ্যমের কাছে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার দেওয়া বক্তব্য নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন করেছে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির বিএনপি ও আওয়ামীপন্থী আইনজীবীরা। শনিবার (১৪ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির মিলনায়তনে পূর্ব ঘোষিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন। এরপরপরই সংবাদ সম্মেলনে করেন আওয়ামীপন্থী আইনজীবী সমিতির সদস্যরা।
বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের সম্মেলনসমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন লিখিত বক্তব্যে বলেন, ‘প্রধান বিচারপতির বক্তব্যে পরিষ্কার হয়েছে যে, ষোড়শ সংশোধনীর পরই বিচার বিভাগ তথা প্রধান বিচারপতির ওপর এই হামলা। প্রধান বিচারপতি অসুস্থ নন, তার বক্তব্যেই এটা প্রমাণ হয়েছে, যা সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি এতদিন বলে আসছিল।’

প্রধান বিচারপতিকে জোর করে ছুটিতে পাঠানো হয়েছে দাবি করে জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘সমগ্র বিচার বিভাগ এবং বিচারকদের ওপর হুমকির সৃষ্টি হয়েছে।’ এ অবস্থায় বিচার বিভাগকে বাঁচাতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

প্রধান বিচারপতির দেওয়া বক্তব্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আইনজীবী সমিতি যা এতদিন দৃঢ়তার সঙ্গে বলে আসছে তাই সত্য হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। আমরা আজ সারা দেশের আপামর জনগণ এবং আইনজীবীদের সর্বত্র সহযোগিতা কামনা করছি, বিচার বিভাগ রক্ষার আন্দোলনে শরিক হওয়ার জন্য।’

তিনি রাষ্ট্রপতির উদ্দেশে বলেন, ‘রাষ্ট্রের প্রধান হচ্ছেন রাষ্ট্রপতি। কাজেই রাষ্ট্রপতির প্রতি আমাদের আহ্বান, আপনি বিচার বিভাগকে বাঁচাতে এগিয়ে আসুন। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করুন।’

তিনি বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক মহল, আইনজীবী ও সরকারের মন্ত্রিরা ব্যক্তিগতভাবে প্রধান বিচারপতির সমালোচনা করেছেন। যা বিব্রতকর বলে প্রধান বিচারপতি তার বক্তব্যে তুলে ধরেছেন। প্রধান বিচারপতিকে হয়তো তার সব বক্তব্য প্রকাশ করতে দেওয়া হয়নি। হয়তো আরও কিছু বলতে চেয়েছিলেন তিনি।’

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপনের আগে বক্তব্য দেন আইনজীবী সমিতির সম্পাদক মাহবুব উদ্দিন খোকন। তিনি বলেন, ‘আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম তারা সাংবিধানিক পদে থেকে সংবিধান লংঘন করেছেন। তাদের সাংবিধানিক পদে থাকার কোনও অধিকার নেই।’ এসময় তিনি সাবেক তিনজন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন করে বিষয়টি (প্রধান বিচারপতির ছুটি ও অসুস্থতা) সুষ্ঠু তদন্তের আহ্বান জানান।

সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের রদবদল প্রসঙ্গে সমিতির সম্পাদক খোকন বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি বলে গিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টে সরকার হস্তক্ষেপ করছে। আইনমন্ত্রী বলেছেন, প্রশাসনের রদবদল করছে। এতে প্রধান বিচারপতির বক্তব্য প্রমাণিত হয়েছে, এতে মন্ত্রিরা জড়িত। আরও অনেকেই জড়িত।’

বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়ে খোকন বলেন, ‘এসব অভিযোগ আবেদন আকারে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির নিকট দাখিল করা হোক। কারণ দেশের প্রধান বিচারপতি যদি অভিযোগ করে সেই অভিযোগ যদি সুরাহা না হয়, তদন্ত না হয় এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না হয় তাহলে দেশে সংবিধান থাকবে না। সংবিধানের ওপর আস্থা থাকবে না।’

সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামীপন্থী আইনজীবীরা উপস্থিত হলে হট্টগোলের সৃষ্টি হয়এদিকে আইনজীবী সমিতির বিএনপিপন্থীদের সংবাদ সম্মেলন শেষ হতে না হতেই সমিতির সহ-সভাপতি অজিউল্লাহ’র নেতৃত্বে একই স্থানে পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করতে যায় আওয়ামীপন্থীরা। এসময় মিলনায়তনে হট্টগোল শুরু হয়। পাল্টাপাল্টি স্লোগান আর বাকবিতণ্ডার মধ্যে আওয়ামীপন্থীরা মিলনায়তন থেকে বের হয়ে আসে।

পরে সমিতি ভবনের প্রবেশ মুখে সাংবাদিকদের ডেকে নিয়ে কথা বলেন আইনজীবী সমিতির সহ-সভাপতি মো. অজিউল্লাহ। তিনি বলেন, ‘কিছুক্ষণ আগে আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সম্পাদক যে সংবাদ সম্মেলনে করেছেন তা ছিল তাদের ব্যক্তিগত। এটা ছিল তাদের দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন। আমরা সম্পূর্ণভাবে তাদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট বারের আমরা ছয়জন নির্বাচিত কর্মকর্তা আছি। আমাদের পরিষ্কার বক্তব্য হলো- প্রধান বিচারপতি নিজে ছুটি নিয়ে স্বেচ্ছায় বিদেশ গিয়েছেন। তার ছুটি নিয়ে কোনও বিতর্ক নেই। তিনি নিজেই বলেছেন, ছুটি শেষে তিনি আবার ফিরে আসবেন।’

যাওয়ার আগে সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনে রদবদল নিয়ে প্রধান বিচারপতি যে বক্তব্য দিয়েছেন তা সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদকে লঙ্ঘন করেছে দাবি করে অজিউল্লাহ বলেন, ‘৯৭ অনুচ্ছেদে বলা আছে- প্রধান বিচারপতি যদি রাষ্ট্রপতির নিকট ছুটি নেন তাহলে প্রধান বিচারপতি অনুপস্থিতিতে যাকে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দেওয়া হবে তিনি বিচারিক ও প্রশাসনিক সকল কার্য পরিচালনা করবেন। এতে সাংবিধানিক কোনও বাধা নেই।’