প্রিজন ভ্যানে যেভাবে হামলা চালান বিএনপিকর্মীরা

পুলিশের প্রিজন ভ্যানে হামলা (ছবি: নাসিরুল ইসলাম)আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার সময় পুলিশের ওপর হামলা চালিয়েছেন বিএনপির কর্মী-সমর্থকরা। প্রিজন ভ্যান ভেঙে পুলিশ সদস্যদের ওপর আক্রমণ করে আসামি ছিনিয়ে নিয়ে যান তারা। আসামি ছিনতাই ঠেকাতে এসে বিএনপি সমর্থকদের হামলার শিকার হয়েছেন পুলিশ সদস্যরা। হামলায় ভেঙে গেছে পুলিশের একটি রাইফেলের বাট। আহত হয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্তত তিন জন সদস্য।

মঙ্গলবার (৩০ জানুয়ারি) বিকালে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার শুনানি শেষে আদালত থেকে বহর নিয়ে ফেরার সময় জাতীয় প্রেসক্লাব সংলগ্ন কদম ফোয়ারা মোড়ে এ হামলার ঘটনা ঘটে। বিকাল ৩টা ৪০ মিনিট থেকে শুরু করে ৩টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত মোট পাঁচ মিনিটে এই হামলা চালিয়ে আসামি ছিনতাই করা হয়।

তবে বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, গাড়িবহরে থাকা নেতাকর্মীদের ওপর ন্যাক্কারজনকভাবে হামলা করা হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের অনেককে। নেতাকর্মীদের ওপর পুলিশের হামলা ও গ্রেফতারে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশের বর্ণনা অনুযায়ী, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার শুনানি শেষে আদালত থেকে বহর নিয়ে ফিরছিলেন খালেদা জিয়া। দোয়েল চত্বর হয়ে হাইকোর্ট মাজার গেটের সামনে দিয়ে কদম ফোয়ারার দিকে যাচ্ছিল সেটি। এই বহরের সামনে ছিল কয়েকশ’ মোটরসাইকেল।

প্রিজন ভ্যান ভাঙচুরের পর পুলিশের ওপর হামলা (ছবি: নাসিরুল ইসলাম)ওদিকে কদম ফোয়ারা সংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহের প্রধান ফটকের সামনে আসামি নিয়ে অপেক্ষমাণ ছিল একটি প্রিজন ভ্যান। এর ভেতরে অন্তত দুই জন আসামি, ড্রাইভিং সিটে একজন ও প্রিজন ভ্যানের পেছনের গেটে ছিলেন একজন পুলিশ সদস্য।

বহরের সামনের দিকে থাকা নেতাকর্মীরা প্রিজন ভ্যানটি ক্রস করার সময় ভেতর থেকে আটক দু’জন ছাড়িয়ে নেওয়ার আকুতি জানান। আটক দু’জনকে দেখে কিছুসংখ্যক নেতাকর্মী ভ্যানটি পেরিয়ে সামনে চলে যান। আর কিছুসংখ্যক নেতাকর্মী ভ্যানটির কাছে এসে থেমে যান। তখন সময় বিকাল ৩টা ৪০ মিনিট। হৈ-হুল্লোড় শুরু করেন তারা। এ অবস্থা দেখে সামনে-পেছনে থাকা নেতাকর্মীরাও ছুটে আসেন। একপর্যায়ে প্রিজন ভ্যানে হামলা চালানো হয়। ভাঙচুর করা হয় গাড়ির কাচ ও দরজা। একইসঙ্গে ভ্যানের সঙ্গে থাকা পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা চালানো হয়। তখন প্রেসক্লাবের ভেতর ও বাইরে আগে থেকে অবস্থান করা নেতাকর্মীদের সামলাতে ব্যস্ত ছিল পুলিশ।

প্রিজন ভ্যান ভাঙচুরের পর পুলিশের ওপর হামলা (ছবি: নাসিরুল ইসলাম)প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, প্রিজন ভ্যানে হামলা হওয়ার সময় কদম ফোয়ারা এলাকা পার হচ্ছিলেন খালেদা জিয়া। এরই মধ্যে প্রিজন ভ্যানের দরজা ভেঙে দুই আসামিকে ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এ অবস্থা দেখে রাস্তার ওপার থেকে পুলিশ সদস্যরা এগিয়ে আসার চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রেসক্লাবের সামনে থাকা নেতাকর্মী ও প্রিজন ভ্যানে হামলা চালানো নেতাকর্মীদের দ্বিমুখী অবস্থান ঠেকাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছিলেন পুলিশ সদস্যরা। ভ্যানে হামলাকারীদের ঠেকাতে এসে তারাও হামলার শিকার হন। পুলিশকে লক্ষ্য করে দূর থেকে ইট-পাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।

ঘটনা শুরুর চার মিনিটের মাথায় অবস্থা বিশৃঙ্খল দেখে এগিয়ে আসেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাকর্মীরা। নবীনদের বুঝিয়ে পাঁচ মিনিটের মাথায় তারা কদম ফোয়ারা এলাকা ত্যাগ করেন।

পুলিশের রমনা জোনের এডিসি আজিমুল হক হামলা প্রসঙ্গে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বঙ্গবাজার থেকে আগেই একটি মিছিল আসছিল। আমরা তাদের প্রেসক্লাবের দিকে ফিরিয়ে দেই। ততক্ষণে খালেদা জিয়ার গাড়িবহর হাইকোর্ট মোড় হয়ে কদম ফোয়ারার দিকে আসছিল। হঠাৎ বহর থেকে প্রিজন ভ্যানে হামলা চালানো হয়। আমাদের দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের ওপর ইট-পাটকেল ছুড়ে হামলা চালিয়েছে তারা।’

হামলায় ভেঙে যায় পুলিশের রাইফেল বাট (ছবি: নাসিরুল ইসলাম)এডিসি আজিমুল হকের দাবি, ‘পুলিশ ঘটনাস্থলে সহনশীল আচরণ করলেও নেতাকর্মীরা উগ্র ছিল। তারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে হামলা চালিয়েছে। তাদের ইট-পাটকেল ঠেকাতে গিয়ে আমাদের একজন পুলিশ সদস্যের রাইফেলের বাট ভেঙে গেছে।’

প্রিজন ভ্যান ভাঙচুর ও পুলিশের ওপর হামলা প্রসঙ্গে রমনা জোনের ডিসি মারুফ হোসেন সরদার বলেন, ‘খালেদা জিয়া কোর্ট থেকে ফেরার পথে আমরা যথেষ্ট ধৈর্যশীল ছিলাম। আমাদের একটি প্রিজন ভ্যান ভাঙচুর করা হয়েছে। আটক থাকা দুই কর্মীকে তারা ছিনিয়ে নিয়েছে। তাদের হামলায় আমাদের একজন এএসআই সহ তিন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।’

প্রিজন ভ্যান ভাঙচুরের পর পুলিশের ওপর হামলা (ছবি: নাসিরুল ইসলাম)রমনা জোনের ডিসি আরও জানান, পুলিশের প্রিজন ভ্যানে হামলা ও ছাত্রদলের দুই কর্মীকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় ৬৯ জনকে ইতোমধ্যে আটক করেছে থানা পুলিশ। এ ঘটনায় শাহবাগ থানায় পৃথক দুটি মামলার প্রক্রিয়া চলছে।

এদিকে নেতাকর্মীদের ওপর হামলা ও গ্রেফতারের প্রতিবাদ জানিয়েছে বিএনপি। এক বিবৃতিতে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আদালতে দেশনেত্রীর হাজিরার দিনগুলোতে তার গাড়িবহরের সঙ্গে থাকা নেতাকর্মীদের ওপর পুলিশ ন্যাক্কারজনক হামলা চালাচ্ছে, গ্রেফতার করছে। দেখে মনে হচ্ছে, এটি যেন পুলিশের রুটিন ওয়ার্ক হয়ে গেছে।’

বিএনপি মহাসচিবের ভাষ্য, ‘বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর জুলুম-নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদে ভোগ করতে বর্তমান শাসকগোষ্ঠী জাতীয়তাবাদী শক্তিকে কখনোই নির্মূল করতে পারবে না। পুলিশকে দিয়ে বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার ও হামলা চালিয়ে আমাদের নেতাকর্মীকে আহত করার ঘৃণ্য আচরণের প্রতি তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। অবিলম্বে গ্রেফতার হওয়া নেতাকর্মীদের নিঃশর্ত মু্ক্তির জোর দাবি জানাই। পুলিশি হামলায় আহত নেতাকর্মীদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করছি।’