আধ্যাত্মিক পুরুষ সাজতে গিয়ে ধরা ‘টেরট বাবা’

কথিত আধ্যাত্মিক পুরুষ ‘টেরট বাবা’ ছবি- তার ফেসবুক থেকে নেওয়ানিজের হাতে জিন ধরা, ব্রেইন দিয়ে লাইট জ্বালানো, খালি হাতে মোমবাতি জ্বালানো, মানুষের মনের কথা বলে দেওয়াসহ বিবিধ সমস্যার সমাধানে কাজ করে আসছিল এম. এম. জাহাঙ্গীর রেজা ওরফে রাদবি রেজা ওরফে টেরট বাবা। একটি বেসরকারি রেডিও’র নাম, নিজের ইউটিউব চ্যানেল ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে বেশ পরিচিতিও পেয়েছিল সে। হতে চেয়েছিল আধ্যাত্মিক পুরুষ। কিন্তু বেশিদূর এগুতে পারেনি। কারণ, এ কাজগুলো সে করতো হাতের কৌশল আর প্রতারণার মাধ্যমে। আধ্যাত্মিকতার ফাঁদ পেতে জনগণের কাছ থেকে হাতিয়ে নিতো মোটা অংকের টাকা।

২৮ ফেব্রুয়ারি তাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অর্গানাইজড ক্রাইম ইউনিট। গত ১২ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে রাদবি রেজার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। সেই মামলাতেই তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।

সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, রাদবি রেজা ওরফে ‘টেরট বাবা’ ২০১৬ সালের অক্টোবরে এবিসি রেডিওতে প্যারানরমাল রিসার্চার হিসেবে যুক্ত হয়। রেডিওটিতে আগে শুধু ভৌতিক গল্প শোনানো হতো। রাদবি রেজা যুক্ত হওয়ার পর শুরু হয়—টেরট কার্ড সেগমেন্ট। আর টেরট কার্ডকে বলা হয়ে থাকে অভিশপ্ত কার্ড। এই কার্ডের মাধ্যমে মানুষের বর্তমান, অতীত ও ভবিষ্যৎ বলে দেওয়া যায়। যদিও এটাকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। রেডিও’র সেগমেন্টে অংশ নেওয়া মানুষের ফোন নাম্বার ও তথ্য ব্যক্তিগত সংগ্রহে রাখতো রাদবি। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেও টার্গেট ব্যক্তির তথ্য সংগ্রহ করতো।

জাহাঙ্গীর রেজা ওরফে রাদবি রেজা ওরফে ‘টেরট বাবা’ ছবি- সিআইডিপরবর্তীতে টার্গেট ব্যক্তির সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করে তার সংগ্রহে থাকা ব্যক্তিগত তথ্যগুলো আগে থেকেই বলে দিতো। এতে টার্গেট ব্যক্তির মনে বিশ্বাস জন্মাতো রাদবির আধ্যাত্মিক ক্ষমতা রয়েছে, যা দিয়ে অনেক গোপন বিষয় বলে দিতে পারে।

এই অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ বলে দেওয়াকে সত্য ভেবে অনেকে তার ভক্ত হয়ে যেত। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সে টাকা-পয়সা হাতিয়ে নেওয়াসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা আদায় করতো। মানুষের সমস্যা সমাধানের জন্য আতর, মুক্তা (নকল), আংটি ইত্যাদি দিতো। টাকার বিনিময়ে ভক্তদের এসব কিনে নিতে হতো।

রাদবি  মানুষের বিশ্বাসকে পুঁজি করে প্রতারণা করে আসছিল। কিছুই না জেনে সে একটা কিছু বলে দিতো। আর তার কথায় বিশ্বাস করে মোটা অংকের টাকা দেওয়ার পাশাপাশি সংসার ভাঙার মতো ঘটনাও ঘটেছে।

রাদবির কথা শুনে স্বামী তাকে তালাক দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী এক নারী। তিনি বলেন, ‘রাদবি আমার স্বামীকে বলেছিল—অন্য এক পুরুষের সঙ্গে আমার সম্পর্ক রয়েছে। আর আমার স্বামী তার কথায় বিশ্বাস করে আমাদের সংসার ভেঙে দিয়েছেন। আসলে আমার সঙ্গে অন্য কোনও পুরুষের সম্পর্ক ছিল না। সবই ছিল এই প্রতারক রাদবির চাল।’

‘টেরট বাবা’র ওয়েবসাইটের স্ক্রিনশটসিআইডির দেওয়া তথ্য ও খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ‘ডর টেরট’ নামে একটি ওয়েবসাইট রয়েছে রাদবির। এছাড়া রয়েছে ইউটিউব চ্যানেল ও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট। প্রতিটিতেই রয়েছে ফলোয়ার ও দর্শক। এসব মাধ্যমে সে নিজের বিভিন্ন আধ্যাত্মিক যোগ্যতা দেখিয়ে ভিডিও ও লেখা দিতো—যা দেখে সহজ-সরল মানুষের মনে বিশ্বাস জন্মায়।’

সিআইডির সিনিয়র এএসপি (লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং) শারমিন জাহান জানান, টেরট কার্ডের মাধ্যমে যে কাউকে লটারিতে জিতিয়ে দেওয়া, খেলার ফলাফল আগে থেকে বলে দেওয়া, পরীক্ষার ফল আগে বলে দিতে পারা, ক্যান্সার ও প্যারালাইসিসের রোগীকে ভালো করে দেওয়া, এমনকি কোমায় থাকা রোগীকেও সুস্থ করে তুলতে পারে সে—এসব প্রচারণা চালাতো রাদবি। ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এগুলোর ভিডিও প্রচার করার পর মানুষ বিশ্বাস করে তার কাছে আসতো। আর প্রতারিত হতো। এগুলো সবই তার প্রতারণার কৌশল।

‘ডর টেরট’ ওয়েবসাইটের হোম পেজের ওপরে লেখা রয়েছে—‘‘অজানাকে জানতে আপনাদের জন্য বাংলাদেশে এই প্রথম ‘Tarot Card’ নিয়ে ওয়েবসাইট তৈরি হলো। ভাগ্য গণনা প্রাচীনকাল থেকে এই আধুনিক সময় পর্যন্ত চলে আসা এরকম একটি রীতি, যা আমাদের কখনও আকৃষ্ট করেছে, কখনও সৃষ্টি করেছে আলোড়ন, কখনও অপার বিস্ময়ের অনুভূতির সর্বোচ্চ সীমায় নিয়ে গিয়েছে। ভাগ্য গণনা কখনও কখনও আবির্ভূত হয়েছে ভীষণ নিষিদ্ধ ট্যাবু হিসেবে। কিছু কিছু বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৫ শতকের মাঝামাঝি থেকে চলে আসা ‘ট্যারট কার্ড’-এর (বিভিন্ন প্রকার ছবি সংবলিত সাধারণ তাস খেলার কার্ডের অনুরূপ) মাধ্যমে ভাগ্যকে নেড়েচেড়ে দেখা বেশ জনপ্রিয় এবং প্রচলিত ছিল, বর্তমানেও এটির ব্যবহার দেখা যায়। ট্যারট কার্ডের রয়েছে একটি অদ্ভুত, জাদুময় ইতিহাস, যার মাধ্যমে হয়তো মধ্যযুগের মানুষদের মানসিকতা, জীবনযাপন ধরন ইত্যাদির ধারণা দিয়ে থাকে। তাদের বিশ্বাসের সাত-পাঁচ দেখা যায়, প্রতিটি ট্যারট কার্ডের বিস্ময়কর, আদিভৌতিক, ঐন্দ্রজালিক সব ছবির মাধ্যমে।’’

‘টেরট বাবা’র ওয়েবসাইটের স্ক্রিন শটওয়েবসাইটের হোমপেজে আরও বলা হয়,  ‘টেরট কার্ড’ পড়তে পারে এমন মানুষের সংখ্যা পৃথিবীতে কম। আর এই কমসংখ্যক মানুষের মধ্যে নিজেকে একজন দাবি করে ওয়েবসাইটে লেখা রয়েছে, ‘সারা পৃথিবীতে খুব কম সংখ্যক মানুষই টেরট কার্ড পড়তে পারে, তাদের মধ্যে রাদবি রেজা একজন। সারাবিশ্বে এখনও কোটি কোটি মানুষ যেকোনও শুভ কাজ করার আগে টেরট রিডিং করে জেনে নেন— কী হবে আসলে... ।’

সিআইডি অর্গানাইজড ক্রাইম বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্যা নজরুল ইসলাম শুক্রবার (০২ মার্চ) এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘এগুলো প্রতারণার কৌশল। আধ্যাত্মিক ক্ষমতা বা সুপার ন্যাচারাল কিছু না। হাতের কৌশল দেখিয়ে ভিডিও তৈরি করতো। আর সেগুলোই পরবর্তীতে প্রচার করা হতো। এছাড়া টেরট কার্ড কন্সালটেন্সি ফার্ম নামে একটি প্রতিষ্ঠানও আছে তার। যেখানে তার সঙ্গে দেখা করার জন্য সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টায় ২০ হাজার ৪০০ টাকা গুনতে হতো।’

তিনি আরও বলেন, ‘রেডিওতে তার প্রোগ্রাম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারিত ভিডিও দেখে বিভ্রান্ত হয়ে মানুষ তার কাছে আসতো। আর মানুষের বিশ্বাস কাজে লাগিয়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিতো সে।’

এম. এম. জাহাঙ্গীর রেজা ওরফে রাদবি রেজা ২০১২ সালের ১৪ জানুয়ারি শেরেবাংলা নগর থানায় ২০টি চোরাই মোটরসাইকেলসহ গ্রেফতার হয়েছিল।