দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা সাধারণত পারস্পরিক যোগাযোগের জন্য বিভিন্ন অ্যাপস ব্যবহার করে থাকে। বাংলাদেশেও বিভিন্ন সময়ে নব্য জেএমবি এবং আনসার আল ইসলামের সদস্যদের গ্রেফতারের পর অ্যাপসের মাধ্যমে যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। বর্তমানে অধিক নিরাপত্তার কারণে জঙ্গিরা টেলিগ্রাম অ্যাপসটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে থাকে। আর নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলাম তাদের সাংগঠনিক কৌশল বদলিয়ে সদস্যদের নিজ বাড়িতেই থেকে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালানোর নির্দেশনা দিয়েছে, যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সন্দেহ করতে না পারে। তবে মাঝে মধ্যে স্লিপার সেলের সদস্যরা মারকাজে মিলিত হতো। গোপন আস্তানাকে আনসার আল ইসলাম ‘মারকাজ’ বলে অভিহিত করে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, টেলিগ্রাম অ্যাপসের মাধ্যমে ফয়জুরের সঙ্গে কোনও একটি সংগঠিত গ্রুপের যোগাযোগ ছিল। এছাড়া মাঝে মধ্যে উধাও হয়ে যাওয়ার কারণে এই সন্দেহ আরো ঘনীভূত হয়েছে। এজন্য ফয়জুরকে আনসার আল ইসলামের সদস্য বলেই এখন মনে করা হচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতার হওয়া আনসার আল ইসলামের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করে তাদের যে সাংগঠনিক কৌশল জানা গেছে, তার সঙ্গে হামলার ধরন, ফয়জুরের আচরণ এবং জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য মিলে যাচ্ছে। ফয়জুরকে আনসার আল ইসলামের কোনও একটি ‘স্লিপার সেলে’র সদস্য হিসেবে ধারণা করা হচ্ছে।
গত শনিবার বিকেলে দেশের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, কথাসাহিত্যিক এবং শাহজালাল বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের ওপর হামলা চালায় এক তরুণ। তাৎক্ষণিক জাফর ইকবালকে হাসপাতালে নেওয়ার পাশাপাশি হামলাকারী ওই তরুণকে আটক করে শিক্ষার্থীরা, যার কাছ থেকে একটি রক্তমাখা কমান্ডো নাইফ (ছুরি) উদ্ধার করা হয়। দেশজুড়ে আলোচিত এই ঘটনাটির রহস্য উন্মোচনে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের পাশাপাশি, র্যাব, সিআইডি, পিবিআই এবং ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট একযোগে কাজ করছে। জঙ্গি প্রতিরোধ ও তদন্তে বিশেষায়িত ইউনিট সিটিটিসির দুজন অতিরিক্ত উপ-কমিশনারের নেতৃত্বে একটি দল সিলেট গিয়ে ফয়জুরকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। তাদের এ ধরনের হামলা তদন্তের পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে।
বিভিন্ন সংস্থার একাধিক কর্মকর্তারা বলছেন, জাফর ইকবালের ওপর হামলার ঘটনাটি ‘সংগঠিত হামলা’ বলেই ধারণা করা হচ্ছে। যদিও জিজ্ঞাসাবাদে এখনও ফয়জুর তার সঙ্গে আরও কেউ ছিল কিনা সে বিষয়ে মুখ খোলেনি। তবে ফয়জুরকে জিজ্ঞাসাবাদকারী কর্মকর্তাদের একজন জানিয়েছেন, টেলিগ্রাম অ্যাপস ব্যবহার করতো সে। কিন্তু টেলিগ্রাম অ্যাপস ব্যবহার করে কার সঙ্গে বা কোনও গ্রুপের সঙ্গে সে যোগাযোগ করতো সে বিষয়ে কিছু বলছে না। এছাড়া প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ফয়জুর এবং তার পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছে, মাঝে মধ্যেই সে বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যেত। এই বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যাওয়াটিও নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের সাংগঠনিক কৌশলের সঙ্গে মিলে যায়। উধাও হয়ে ফয়জুর কোনও একটি স্লিপার সেলের মারকাজে অবস্থান করতো বলেই তারা ধারণা করছেন।
ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের এক কর্মকর্তা বলছেন, ফয়জুরকে এমনভাবে মোটিভেটেড করা হয়েছিল, হামলার সময় মৃত্যুর জন্যও প্রস্তুতি ছিল তার। এজন্য তার কাছ থেকে এখন তথ্য পাওয়া কষ্টকর হচ্ছে। আহত থাকায় তাকে হাসপাতালে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। কৌশলী ফয়জুর বেশিরভাগ প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এমনিতেই জঙ্গি সদস্যদের কাছ থেকে তথ্য আদায় করতে সময় লাগে। ফয়জুরের ক্ষেত্রেও তা-ই হচ্ছে।