তবুও চলছে সিসা লাউঞ্জ

সিসা লাউঞ্জমাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে সিসা একটি নিষিদ্ধ মাদক পণ্য। এই আইনে সিসা সেবন এবং বিক্রিও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও রাজধানীর বিভিন্ন অভিজাত হোটেল ও রেস্টুরেন্টের সিসা লাউঞ্জগুলোতে হরদমে বিক্রি হচ্ছে মাদক পণ্য সিসা। গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, উত্তরা, মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় এমন চিত্র দেখা গেছে।

বনানীর ১১ নম্বর সড়কের ৫৪ নম্বর ভবনের ষষ্ঠ তলায় রয়েছে ফ্লোর সিক্স রিলোডেট নামে একটি রেস্টুরেন্ট। প্রতিষ্ঠানটির ফেসবুক পেজে সিসা সেবনের বিভিন্ন সরঞ্জামের ছবি রয়েছে। উদ্যোক্তারা রেস্টুরেন্টের নাম করে সেখানে সিসা লাউঞ্জ পরিচালনা করছে। গত ২৯ এপ্রিল রাতে সরেজমিন দেখা যায়, লাউঞ্জের ভেতরে উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণীরা সিসা সেবন করছে। হাইলি ডেকোরেটেড রেস্টুরেন্টটিতে রয়েছে কোয়ালিটি সাউন্ড সিস্টেম। বিভিন্ন রঙের মৃদু আলোয় গান শুনতে শুনতেই সিসা সেবন করছে ৩-৪ জনের একেকটি গ্রুপ। লাউঞ্জের ওপেন ফ্লোরে (ছাদ বাগান) প্রতিটি টেবিলে দেখা গেলো তরুণ-তরুণীদের ভিড়। অর্ডার করা মাত্র সিসা সাজিয়ে টেবিলে এনে দিচ্ছেন লাউঞ্জের স্টাফরা। দেখা যায়, লাউঞ্জের একটি কক্ষে রয়েছে অনেক রাজকীয় হুক্কা। দুজন কর্মী অর্ডার অনুযায়ী কাস্টমারদের সিসা সাজিয়ে দিচ্ছেন।সিসা লাউঞ্জ

ফ্লোর সিক্স রিলোডেট সিসা লাউঞ্জের ম্যানেজার মো. জীবন কায়সার বলেন, ‘এখানে দিনরাত সিসা সেবন চলে। তবে রমজান মাসে আমাদের সার্ভিস থাকবে শুধু ইফতারের পর থেকে রাত পর্যন্ত।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, লাউঞ্জ চালাতে কোনও ঝামেলা নেই। এখানে বিভিন্ন ফ্লেবারের সিসা পাওয়া যায় এবং মানসম্মত সিসা দেওয়া হয় বলে আমাদের কাস্টমারও বেশি।’

মাদক আইনে সিসা সেবন ও বিক্রি নিষিদ্ধ, তারপরও কীভাবে ব্যবসা করছেন প্রশ্নে জীবন কায়সার বলেন, ‘এটা তো ক্ষতিকর নয়। যারা সেবন করে, আমরা তাদের সাধারণ সিসা দিচ্ছি। যদিও আইনি বিষয় নিয়ে কথা হচ্ছে, আশা করি, শিগগিরই সমস্যার সমাধান হবে।’সিসা লাউঞ্জ

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের ঢাকা মেট্রো উপ-অঞ্চলের সহকারী পরিচালক (এডি) মো. খোরশেদ আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। কেউ যদি সিসা লাউঞ্জ পরিচালনার সাহস করে, তবে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারণ, সিসা আইনত নিষিদ্ধ মাদক।’

এর আগে, গত ২৯ জানুয়ারি সন্ধ্যায় গুলশান-১ নম্বরে গুলশান শপিং সেন্টারের তৃতীয় তলার একটি গোডাউন থেকে সিসা বিক্রি ও সরবরাহের অভিযোগে দুই মাদক ব্যবসায়ী মহিউদ্দিন হারুন (৩৬) ও মো. রাসেলকে (২১) গ্রেফতার করে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের একটি দল। এ সময় ওই গোডাউন থেকে ৫০ কেজি সিসা, সিসা সেবনের উপকরণ কয়লা ৬০ কেজি, ছোটবড় ২০টি হুক্কা এবং সিসা বিক্রির নগদ এক লাখ ৬০০ টাকা উদ্ধার করা হয়। এ বিষয়ে রাজধানীর গুলশান থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়। আসামিরা বর্তমানে কারাগারে রয়েছে।সিসা লাউঞ্জের মূল্য তালিকা

গুলশান শপিং সেন্টারে অবস্থিত স্ট্যালিন এন্টারপ্রাইজের মালিক স্ট্যালিন গোমেজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার দোকানের সামনেই ওই দোকানটি। সবসময় একটি শাটার নামানো থাকতো। দুই-একজন কাস্টমারও আসতে দেখতাম। অনেক সৌখিন মানুষও ওই দোকান থেকে সিসা ও বড় বড় হুক্কা কিনতেন।’

গত ১২ জানুয়ারি ধানমন্ডির ৭/এ নম্বর রোডের এইচটুও সিসা লাউঞ্জে অভিযান চালায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। ওই সিসা লাউঞ্জের রান্নাঘর থেকে ৭৫০ গ্রাম সিসা উদ্ধারসহ তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়। সেখানে সিসা খাওয়ার বিভিন্ন উপকরণ ও চার সেট হুক্কা জব্দ করা হয়।

২০১৮ সালের ২৭ ডিসেম্বর থেকে ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮’ কার্যকর হয়েছে। ওই নতুন আইনে সিসাকে মাদকদ্রব্যের ‘খ’ শ্রেণির তালিকাভুক্ত করে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নতুন আইনে মাদক সম্পর্কিত অপরাধ প্রমাণিত হলে ন্যূনতম এক বছর থেকে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড ও নগদ অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু মাদক ব্যবসায়ীরা আইনের  তোয়াক্কা করছে না। তারা নানা কৌশলে নিষিদ্ধ সিসা কেনাবেচা অব্যাহত রেখেছে।গুলশানে সিসা লাউঞ্জের গোডাউন

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানান, গুশলান শপিং সেন্টারে ৩০০/১৮বি নম্বর ‘ওয়েভ আর্ট’ দোকানটি ছিল নিষিদ্ধ মাদক সিসা ও সিসা সেবনের বিভিন্ন উপকরণ বিক্রির একটি দোকান। দোকান হলেও গ্রেফতার ব্যক্তিরা সেটিকে মাদকের গোডাউন হিসেবে ব্যবহার করতো। দীর্ঘদিন ধরে সেখানে নিষিদ্ধ মাদক সিসার ব্যবসা করে আসছিল মহিউদ্দিন হারুন। সে গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, উত্তরা,মিরপুরসহ রাজধানীর বেশিরভাগ লাউঞ্জে নিষিদ্ধ সিসা সরবরাহ করতো।

জানা গেছে, মাদক ব্যবসায়ী এই হারুন ঢাকার সিসা লাউঞ্জগুলোর চাহিদা অনুযায়ী দুবাইয়ের আল  ফাখের সিসা অ্যান্ড টোবাকো কোম্পানি থেকে বিভিন্ন ফ্লেবারের (অ্যাপেল, ব্যানানা, স্ট্রবেরি, ব্লুবেরি, ক্যাপাসিনো, চেরি, চকলেট, কোকোনাট, জেসমিন) সিসা আমদানি করে গুলশানের গোডাউনে মজুত করতো। সিসা বিক্রিতে তাকে সহযোগিতা করতো মো. রাসেল।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক (এডি) মো. খোরশেদ আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আইন অনুযায়ী সিসা একটি নিষিদ্ধ মাদক। গ্রেফতার আসামিরাও সেটা জানতো। তারপরও বিভিন্ন সিসা লাউঞ্জে তারা সিসা সরবরাহ করে আসছিল। গ্রেফতার মহিউদ্দিন হারুন ও রাসেল প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাদের অপরাধ স্বীকার করেছে।’

তিনি বলেন, ‘রাজধানীতে বারবার অভিযান পরিচালনা করায় অনেক মাদক ব্যবসায়ী সিসা বিক্রি বন্ধ করে রেখেছে। তবে একেবারে বন্ধ হয়নি। গোপনে গোপনে কিছু সিসা লাউঞ্জ এখনও চলছে।’