সোমবার (৩ জুন) জালিয়াতি চক্রের সদস্য ইউক্রেনের ছয় নাগরিককে আদালতে সোপর্দ করার পর তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে গ্রেফতার হওয়া ইউক্রেনিয়ান নাগরিকদের কাছ থেকে পাওয়া এটিএম কার্ডগুলোর ফরেনসিক পরীক্ষার উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ।
অতিরিক্ত উপ-কমিশনার বলেন, ‘ডিজিটাল জালিয়াতি চক্রের সদস্যদের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। গ্রেফতারকৃতরা সবাই রুশভাষী বলে একজন দোভাষী নিয়োগ করা হয়েছে। তারপরও জিজ্ঞাসাবাদে তারা কিছু কিছু বিষয় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। আমরা তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে বিস্তারিত নেটওয়ার্ক জানার চেষ্টা করছি। একইসঙ্গে তাদের অন্য সহযোগীকেও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’
এরআগে, গত শনিবার (১ জুন) সন্ধ্যায় রাজধানীর খিলগাঁও তালতলা এলাকার ডাচবাংলা ব্যাংকের একটি বুথ থেকে অভিনব পদ্ধতিতে জালিয়াতি করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার সময় ইউক্রেনের এক নাগরিককে আটক করেন বুথের নিরাপত্তাকর্মী। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাতে পান্থপথের হোটেল ওলিও ড্রিম হ্যাভেনে অভিযান চালিয়ে আরও পাঁচ নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃতরা হলো, ভ্যালেনটাইন (পাসপোর্ট নম্বর ইওয়াই ০৫১৫৬২), ওলেগ (পাসপোর্ট নম্বর ইএক্স ০৮৯৯৬৩), ডেনিস (পাসপোর্ট নম্বর এফএল ০১৯৮৩৪) নাজেরি (পাসপোর্ট নম্বর এফটি ৫০০৫০১), সারগি (পাসপোর্ট নম্বর এফএইচ ৪২৪৩৯৪) ও ভোলোবিহাইন (পাসপোর্ট এফটি ৩৭৯৯৮৩)। তবে অভিযানের বিষয়টি টের পেয়ে ভিটালি (পাসপোর্ট নম্বর এফই ৮০৪৪৪৮) নামে এক ইউক্রেনিয়ান পালিয়ে গেছে। তাকে ধরার জন্য রাজধানীর বিভিন্ন আবাসিক হোটেলগুলোতে অভিযান চালানো হচ্ছে।
মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জালিয়াত-চক্রের সদস্যরা এমন একটি ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করেছে, যেটি দেখতে হুবহু এটিএম কার্ডের মতো। এই কার্ড এটিএম বুথে প্রবেশ করানোর পর টাকা উত্তোলনের জন্য কোনও নির্দেশনার বোতাম চাপতে হয় না। অটোমেটিকভাবে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা বের হয়ে আসে।
প্রতারক চক্রটি যখন এটিএম বুথ থেকে জালিয়াতি করে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছিল ওই সময়ের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে তাও বিশ্লেষণ করছে মামলার তদন্ত সংস্থা। সিসিটিভি ভিডিওর বরাত দিয়ে তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, জালিয়াত চক্রের এক সদস্য একটি কার্ড এটিএম বুথের ভেতরে প্রবেশ করানোর পরপরই একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বের হয়ে আসে। আর জালিয়াত চক্রের সেই সদস্য সেই টাকা ব্যাগে নেয়। এ সময় জালিয়াত চক্রের ওই সদস্যকে মোবাইলে কথা বলতে ও বাম হাত ব্যাগের ভেতরে কোনও কিছু একটা ধরে রাখছে বলে মনে হচ্ছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এই চক্রের সদস্যরা অন্য কোনও ডিভাইসও ব্যবহার করেছে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, এই জালিয়াত চক্রের যে সদস্য এখনও পলাতক রয়েছে, তার কাছে আরও ডিভাইস থাকতে পারে। তাকে ধরতে পারলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। এছাড়া এই চক্রের সঙ্গে দেশীয় কোনও এজেন্টও থাকতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। কারণ জালিয়াতির কৌশল দেখে মনে হয়েছে তারা পরিকল্পিতভাবে এই কাজটি করেছে। এজন্য তারা বেছেও নিয়েছে খিলগাঁওয়ের মতো এলাকা। সাধারণত বিদেশি নাগরিকরা রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান-বারিধারা ও বনানীর এটিএম বুথ ব্যবহার করার কথা। কিন্তু এসব এলাকার বাসিন্দারা সচেতন বলে তারা খিলগাঁও তালতলার মতো এলাকা বেছে নিয়েছে।
পুলিশের ঊর্ধ্বতন সূত্র জানায়, এই চক্রটির বিষয়ে তারা সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছেন। কারণ এই চক্রের সঙ্গে বিদেশে অবস্থানকারী বড় কোনও সাইবার ক্রিমিনাল চক্রের যোগাযোগ থাকতে পারে। চক্রটি পান্থপথের হোটেল ওলিও ড্রিম হ্যাভেন ছেড়ে অন্য একটি হোটেলে ওঠার চেষ্টা করেছিল। এছাড়া তারা ৬ জুন ঢাকা থেকে ভারতে যাওয়ার জন্য সবকিছু ঠিক করে রেখেছিল। তাদের চক্রের আরও সদস্য ঢাকায় থাকতে পারে বলেও মনে করছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তরা। এজন্য প্রয়োজনে আসামদের কাছ থেকে তথ্য আদায় করতে আবারও রিমান্ডে আনা হবে বলেও জানান তারা।