এটিএম বুথে জালিয়াতি: কাল থেকে জিজ্ঞাসাবাদ, একজন এখনও পলাতক





এটিএম বুথে জালিয়াতি

ডাচ-বাংলা ব্যাংকের বুথ থেকে জালিয়াতি করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে গ্রেফতার ছয় ইউক্রেন নাগরিককে আগামীকাল (৮ জুন) থেকে আবার জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করবে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। গ্রেফতারের পর তিন দিনের রিমান্ডে আনা হলেও দোভাষী না থাকায় তাদের আবারও কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এ ঘটনায় গ্রেফতারকৃতদের সহযোগী এক ইউক্রেন নাগরিক এখনও পলাতক রয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ভিতালি নামে পলাতক ওই ইউক্রেনিয়ানের পাসপোর্ট নম্বর দেশের সব আকাশ ও স্থলবন্দরে দেওয়া হয়েছে। বৈধভাবে তার দেশ ছাড়ার কোনও সুযোগ নেই। তাকে গ্রেফতারে অভিযান চলছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার শাহিদুর রহমান রিপন বলেন, ‘গ্রেফতারকৃতরা ইংরেজি ভাষায় কথা বলতে পারে না। এজন্য রুশ ভাষা জানেন এমন একজন দোভাষীর সহায়তা নিয়ে তাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। ঈদের ছুটির কারণে শনিবার থেকে তাদের আবার জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’

পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘গ্রেফতারকৃতরা সবাই চালাক। তারা সহজেই মুখ খুলতে চাইছে না। তাদের আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সহযোগীদের শনাক্ত করতে প্রয়োজনে আবারও রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’ একইসঙ্গে পলাতক ভিতালিকে ধরতেও অভিযান চালানো হচ্ছে বলে জানান তিনি।

গত শনিবার (১ জুন, ২০১৯ইং) সন্ধ্যায় রাজধানীর খিলগাঁও তালতলা এলাকার ডাচ-বাংলা ব্যাংকের একটি বুথ থেকে অভিনব পদ্ধতিতে জালিয়াতি করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার সময় ইউক্রেনের এক নাগরিককে আটক করে বুথের নিরাপত্তাকর্মীরা। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাতে পান্থপথের হোটেল ওলিও ড্রিম হ্যাভেনে অভিযান চালিয়ে আরও পাঁচ জনকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃতরা হলো, ভ্যালেনটাইন (পাসপোর্ট নম্বর ইওয়াই ০৫১৫৬২), ওলেগ (পাসপোর্ট নম্বর ইএক্স ০৮৯৯৬৩), ডেনিস (পাসপোর্ট নম্বর এফএল ০১৯৮৩৪) নাজেরি (পাসপোর্ট নম্বর এফটি ৫০০৫০১), সারগি (পাসপোর্ট নম্বর এফএইচ ৪২৪৩৯৪) ও ভোলোবিহাইন (পাসপোর্ট এফটি ৩৭৯৯৮৩)। তারা সবাই ইউক্রেনের নাগরিক। তবে অভিযানের বিষয়টি টের পেয়ে ভিতালি (পাসপোর্ট নম্বর এফই ৮০৪৪৪৮) পালিয়ে যায়।

ডাচ-বাংলা ব্যাংক ও পুলিশ সূত্র জানায়, খিলগাঁওয়ের ঘটনার একদিন আগে এই চক্রটি বাড্ডা এলাকার একটি বুথ থেকে কয়েক মিনিটের মাথায় তিন লাখ টাকা তুলে নেয়। এমন পদ্ধতিতে তারা টাকা তুলেছিল, যেন টাকা উত্তোলনের কোনও তথ্যই ব্যাংকের কেন্দ্রীয় সার্ভারের হিসাবে তারতম্য ঘটেনি। এমনকি কোনও গ্রাহকের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকেও টাকা কাটা যায়নি।

গ্রেফতার হওয়া বিদেশি নাগরিকদের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া এটিএম কার্ডের মতো দেখতে চিপসগুলোর ফরেনসিক পরীক্ষা করলে অনেক তথ্য পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। কারণ, এই কার্ডগুলোতে এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যা এটিএম বুথের ভেতর প্রবেশ করানোর সঙ্গে সঙ্গেই একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা বের হয়ে আসে। এটি কীভাবে সেটিংস করা হয়েছিল তা জানার জন্য প্রয়োজনে বিদেশি সংস্থার সহায়তাও নেওয়া হতে পারে বলে জানা গেছে।

পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, ঘটনাটির সঙ্গে যেহেতু আন্তর্জাতিক চক্রের যোগসাজশ রয়েছে, সেজন্য পুরো এই চক্রকে শনাক্ত করতে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ও বিদেশি গোয়েন্দাদের সহযোগিতাও নেওয়া হবে। এই চক্রকে শনাক্ত করতে না পারলে তাতে শুধু বাংলাদেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, বরং অন্যান্য দেশেও এই চক্র আরও বেশি জালিয়াতি শুরু করতে পারে।

এই চক্রটি বাংলাদেশে জালিয়াতি করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার পর ভারতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। তারা ভারতেও একই কায়দায় হয়তো এটিএম বুথ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিতো। বাংলাদেশে আসার আগে অন্য কোনও দেশেও হয়তো তারা জালিয়াতি করেছে। এছাড়া, জালিয়াতি করার সময় তারা নিজেদের মোবাইল ফোনে রোমিংয়ের মাধ্যমে কারও সঙ্গে কথা বলেছে। ধারণা করা হচ্ছে, চক্রের অন্য কোনও সদস্যের সঙ্গে তারা যোগাযোগ রক্ষা করে জালিয়াতির জন্য কোনও প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে। এজন্য এই চক্রের সব সদস্যকে শনাক্ত করা খুবই জরুরি।

ভিতালি এখনও পলাতক
এটিএম বুথ থেকে অভিনব পদ্ধতিতে জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত এই চক্রের অন্যতম এক সদস্য ভিতালি এখনও পলাতক। দেশের আকাশ ও স্থলপথের সব ইমিগ্রেশনে তার বিষয়ে তথ্য দেওয়া রয়েছে। তবে সে এখনও কোনও ইমিগ্রেশন দিয়ে অন্য কোনও দেশে ঢোকার চেষ্টা করেনি। একইসঙ্গে ঢাকার বিভিন্ন আবাসিক হোটেলে তার বিষয়ে খোঁজ করা হচ্ছে।

পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, ধারণা করা হচ্ছে তার কোনও বাংলাদেশি সহযোগী রয়েছে, যে তাকে আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করছে। কারণ, তারা সারাদেশের থানা পুলিশকেও তার বার্তার মাধ্যমে তার বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন। কোনও আবাসিক হোটেলে থাকলেও বিষয়টি জানার কথা। একইসঙ্গে ইউক্রেনের নাগরিকদের এই জালিয়াতির কথা গণমাধ্যমেও প্রচারিত হয়েছে। কোনও আবাসিক হোটেলে অবস্থান করলে হোটেল কর্তৃপক্ষও বিষয়টি স্থানীয় পুলিশকে জানানোর কথা। এজন্য ধারণা করা হচ্ছে, আবাসিক হোটেল ও রেস্টহাউজ এড়িয়ে ভিতালি অন্য কোনও স্থানে বা অপরিচিত কোনও জায়গায় আত্মগোপন করে আছে। তবে, শিগগিরই তাকেও গ্রেফতার করা হবে বলে জানান তিনি।