মঞ্জুর হত্যা মামলা নিষ্পত্তির আগেই এরশাদের চিরবিদায়

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ (ফাইল ছবি)

মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর হত্যা মামলার নিষ্পত্তি দেখে যেতে পারলেন না অভিযুক্ত সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। দীর্ঘ দুই যুগ এই হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ মাথায় নিয়ে রাজনীতির মঞ্চে থাকার পর রবিবার (১৪ জুলাই) ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে মারা যান তিনি।

মঞ্জুর হত্যা মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯৮১ সালের ১ জুন মেজর জেনারেল মঞ্জুরকে পুলিশ হেফাজত থেকে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর সেখানেই তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় হত্যাকাণ্ডের ১৪ বছর পর ১৯৯৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি জেনারেল মঞ্জুরের বড় ভাই ব্যারিস্টার আবুল মনসুর আহমেদ বাদী হয়ে চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এরপর ১৯৯৫ সালের ১৫ জুলাই আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন সহকারী পুলিশ সুপার আবদুল কাহার আকন্দ।
দীর্ঘ ১৯ বছর মামলাটির বিচার কাজ চলার পর ২০১৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত। এরপর রায় ঘোষণার আগেই তৎকালীন বিচারকের বদলি হয়ে নতুন বিচারক হিসেবে যোগ দেন খন্দকার হাসান মাহমুদ ফিরোজ। কিন্তু রায় ঘোষণার আগে ওই বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আসাদুজ্জামান খান রচি এ মামলায় অধিকতর তদন্তের আবেদন করেন। বিচারক ওই আবেদন মঞ্জুর করে সিআইডিকে অধিকতর তদন্ত করে ২২ এপ্রিলের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন।

এরপর দফায় দফায় সময় বাড়ানো হলেও সিআইডি অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন আর জমা দিতে পারেনি। বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করেছেন সিআইডির কর্মকর্তা কুতুব উদ্দিন (এসপি)।

এ হত্যা মামলায় ৪৯ জন সাক্ষীর মধ্যে ২৮ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হওয়ার পর ২০১২ সালের ২ অক্টোবর আত্মপক্ষ সমর্থন করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন এরশাদ। এর সমর্থনে আদালতে লিখিত বক্তব্যও দেন তিনি।

মঞ্জুর হত্যা মামলার অন্য আসামিরা হলেন মেজর (অব.) কাজী এমদাদুল হক ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মোস্তফা কামাল উদ্দিন ভূইঞা। অন্য দুই আসামি মেজর জেনারেল (অব.) আবদুল লতিফ এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) শামসুর রহমান শামসের বিরুদ্ধে মামলার কার্যক্রম উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত রয়েছে।

সবশেষ চলতি বছরের ২৭ জুন নাজিম উদ্দিন রোডের পুরান কেন্দ্রীয় কারাগারের পাশে স্থাপিত ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক শরীফ এ এম রেজা জাকের অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ২৬ আগস্ট দিন ধার্য করেন। এর আগেই রবিবার (১৪ জুলাই) এর‌শাদ মৃত্যুবরণ করেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এরশাদের আইনজীবী শেখ সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘এরশাদের বিরুদ্ধে শুধু মঞ্জুর হত্যা মামলাটি নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে। এ মামলার এজাহারে এরশাদের নাম নেই। পরে তার নাম সংযুক্ত করা হয়। শুনানির সময় রাষ্ট্রপক্ষের কোনও সাক্ষীই ঘটনার সঙ্গে এরশাদের জড়িত থাকার কথা বলেননি। আমাদের বিশ্বাস, এ মামলায় তিনি খালাস পেতেন।’

এদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আসাদুজ্জামান খান রচি বলেন, ‘এই হত্যা মামলাটি অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদনের জন্য ছিল। যেহেতু তিনি মারা গেছেন, আমরা তার অব্যাহতির আবেদন করবো। আদালত যদি তার মৃত্যুর প্রতিবেদন চান, তাহলে প্রতিবেদন এলে তিনি অব্যাহতি পাবেন। তবে, আদালত চাইলে প্রতিবেদন ছাড়াই তাকে মামলা থেকে অব্যাহতি দিতে পারেন।’

উল্লেখ্য, ১৯৯০ সালে গণআন্দোলনের মুখে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এরশাদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে ৪৩টি মামলা দায়ের করা হয়। এরমধ্যে তিনটিতে বিচারিক আদালতে তার সাজার আদেশ হলেও হাইকোর্টে একটিতে খালাস পান। দুটিতে তিনি সাজা খাটেন। রাষ্ট্রপতি থাকার সময় পাওয়া উপহার নিয়ে অনিয়ম, জাপানি নৌযান কেনায় অনিয়ম, জনতা টাওয়ার দুর্নীতি মামলায় তার বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড হয়। এছাড়া স্বর্ণ চোরাচালান, টেলিকম দুর্নীতি, রাজউকের প্লট বরাদ্দে অনিয়ম, তেল অনুসন্ধানে দুর্নীতির অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ১৯টি মামলা ছিল। এরমধ্যে বেশ কয়েকটিতে তিনি বেকসুর খালাস পেয়েছেন। আর কয়েকটিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা।