সম্পদের পাহাড় লোকমানের

গ্রেফতারের পর লোকমান হোসেন ভূঁইয়াঅবৈধভাবে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের ডিরেক্টর ইনচার্জ লোকমান হোসেন ভূঁইয়া। খেলাধুলার বদলে মোহামেডানকে তিনি বানিয়েছিলেন ক্যাসিনোর আখড়া। ক্যাসিনোর জন্য কক্ষ ভাড়া দিয়েই মাসে আয় করতেন ২১ লাখ টাকা। টেন্ডারবাজিতেও ছিলেন সিদ্ধহস্ত। সরকারের প্রভাবশালী এক ব্যক্তির ছত্রছায়ায় ছিলেন তিনি। এর ফলে একসময় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দেহরক্ষী ও পরবর্তী সময়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হওয়ার পরও আওয়ামী লীগ আমলেও দোর্দণ্ড প্রতাপ নিয়ে চলতেন তিনি। স্টেডিয়ামপাড়ায় তার আধিপত্য ছিল একচ্ছত্র। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি তার। বুধবার (২৫ সেপ্টেম্বর) রাতে লোকমানকে আটকের পর তার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে। অনুসন্ধান শুরু করেছে তার অবৈধ সম্পদ ও অর্থপাচারের বিষয়েও।

র‌্যাব-২ কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, ‘লোকমান মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে ক্যাসিনো বসিয়ে প্রতিদিন ৭০ হাজার টাকা করে পেতেন। অস্ট্রেলিয়ার এএনজেড ও কমনওয়েলথ ব্যাংকে তার ৪১ কোটি টাকা গচ্ছিত রয়েছে। একইসঙ্গে বাংলাদেশের একাধিক ব্যাংকেও গচ্ছিত রয়েছে তার বিপুল অর্থ। আমরা এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে দেখছি।’

র‌্যাব ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের ক্যাসিনোটি পরিচালনা করতেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর একেএম মোমিনুল হক ওরফে সাঈদ কমিশনার ওরফে ক্যাসিনো সাঈদ। সাঈদ নিজে আরামবাগ যুব সংঘের সভাপতি। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজিসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে।

সূত্র জানায়, ক্যাসিনো সাঈদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল লোকমানের। দুজন পরামর্শ করে প্রভাব খাটিয়ে ক্লাবের পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকে একটি রেজ্যুলেশন করে ক্যাসিনোর জন্য কক্ষ ভাড়া দেন। তবে ক্যাসিনো থেকে পাওয়া অর্থের প্রায় পুরোটাই ভোগ করতেন লোকমান। এছাড়া, সাঈদের সঙ্গে মিলে টেন্ডারবাজিতে অংশ নিতেন লোকমান।

লোকমান একসময় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দেহরক্ষী ছিলেন। নব্বই দশকের শুরুতে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। বিএনপি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় মোহামেডানের সাধারণ সম্পাদক হন। তখন থেকেই অবৈধভাবে ক্ষমতার ব্যবহার আর নানা অপকর্ম করে বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও সরকারের শীর্ষ এক ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থাকায় অবৈধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হননি। অল্প দিনেই কয়েক শ’ কোটি টাকার মালিক হয়েছেন তিনি।

জানা গেছে, লোকমান একসময় বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যও ছিলেন। পরে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সদস্য হওয়ায় তাকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে তিনি মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের ডিরেক্টের ইনচার্জ পদটিও দখল করে রেখেছেন। 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নব্বই দশকে মোসাদ্দেক আলী ফালুর হাত ধরে লোকমান হোসেন ভূঁইয়ার মোহামেডান ক্লাবে অনুপ্রবেশ ঘটে। ধীরে ধীরে ক্লাবটির বড় পদে জায়গা করে নেন তিনি। একপর্যায়ে ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক পদটি দখল করেন। দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। এরপর ২০১২ সালে লিমিটেড হওয়ার পর ডিরেক্টর ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। এরই মধ্যে লোকমান বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের অ্যাডহক কমিটিতে সদস্য হিসেবে জায়গা করে নেন। এরপর তো পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। তার এই উত্থানে নেপথ্যে থেকে সহযোগিতা করেছেন বিসিবির একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তি। তার সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকায় লোকমান একসময় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকলেও এখন আওয়ামী লীগার বনে গেছে।

সূত্র জানায়, লোকমান ঢাকার কেন্দ্রস্থল তেজগাঁওয়ের মনিপুরী পাড়ায় সাততলা একটি বাড়ির মালিক। উত্তরার সাত নম্বর সেক্টরের ৮ নম্বর সড়কের ১৩ নম্বর বাড়িটিও তার। পূর্বাচলে রয়েছে তার সাড়ে ৭ কাঠার একটি প্লট। মিরপুর বেড়িবাঁধ এলাকায় সাড়ে ৫২ শতাংশ জমি রয়েছে তারা মালিকানায়। ‘ভিনতেজ ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরস’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে তার। প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয় হলো গুলশানে। ঢাকা কমিউনিকেশনস নামে একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থা রয়েছে। মোবাইলফোন কোম্পানির টাওয়ার নির্মাণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে তার। রুটস টেকনিক অ্যান্ড টেকনোলজিস নামে এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় গুলশানের নিকেতনে। সম্প্রতি একটি হজ এজেন্সিও চালু করেছেন।

র‌্যাবের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘‘এতদিন ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’ হওয়ার কথা শুনেছি। লোকমান অল্প দিনেই ‘আঙুল ফুলে বটগাছ’ হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে কিছু তথ্য তিনি স্বীকার করেছেন। মতিঝিলে স্টেডিয়ামপাড়ায় তার নিজের একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। ক্যাসিনো সিন্ডিকেট ও অন্যান্য নানা অপকর্মের মাধ্যমে তিনি কোটি কোটি টাকা আয় করেছেন।’’

সূত্র জানায়, লোকমানের একমাত্র ছেলে লাবিব থাকে অস্ট্রেলিয়ায়। এজন্য তিনি অস্ট্রেলিয়ায় সেকেন্ড হোম তৈরি করছিলেন। অস্ট্রেলিয়ায় বিপুল অর্থপাচার করেছেন তিনি। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি অস্ট্রেলিয়ার এএনজেড ও কমনওয়েলথ ব্যাংকে ৪১ কোটি টাকা গচ্ছিত রাখার কথা স্বীকারও করেছেন। এছাড়া, এইচএসবিসি ব্যাংকেও তার কোটি টাকার এফডিআর রয়েছে।

র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ায় তার কী পরিমাণ সম্পদ রয়েছে, সেসব বিষয়ে খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে। মানি লন্ডারিং ও অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের বিষয়েও খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। পুরো বিষয়টি অনুসন্ধানের পর সংশ্লিষ্ট সংস্থায় প্রতিবেদন দেওয়া হবে বলেও জানান র‌্যাব কর্মকর্তারা।

উল্লেখ্য, ক্যাসিনোবিরোধী চলমান অভিযানের ধারাবাহিকতায় একাধিক ক্লাব ও বারে অভিযান চালাচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এরই ধারাবাহিকতায় বুধবার (২৫ সেপ্টেম্বর) রাতে লোকমানের বাসায় অভিযান চালানো হয়। রাতেই মনিপুরীপাড়ার বাসা থেকে লোকমানকে আটক করে র‌্যাব-২। এ সময় তার বাসা থেকে ছয় বোতল বিদেশি মদও জব্দ করা হয়। আটকের পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য র‌্যাব-২ কার্যালয়ে নেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর তেজগাঁও থানায় তার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য আইনে একটি মামলা দায়ের করেছে র‌্যাব।

আরও পড়ুন: ক্যাসিনো থেকে প্রতিদিন ৭০ হাজার টাকা নিতেন লোকমান