অভিনেত্রী আশার মৃত্যু: নম্বর প্লেটে আলো পড়ায় অন্ধকারে পুলিশ

রাজধানীর দারুস সালাম টেকনিক্যাল মোড়ে ট্রাকের ধাক্কায় অভিনেত্রী আয়েশা আক্তারের (আশা) মৃত্যুর ঘটনার তিন দিন পার হয়ে গেলেও এখনও ট্রাক ও তার চালককে শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। তবে এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় মোটরসাইকেলের চালক শামীম আহমেদকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট পুলিশ সূত্র বলছে, গত সোমবার রাত দুইটার দিকে দারুস সালাম টেকনিক্যাল মোড়ে একটি ট্রাকের ধাক্কায় রাস্তায় ছিটকে পড়েন আয়েশা। এমন একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। সেই ভিডিওতে ট্রাকের নম্বর প্লেটের ওপর পেছনের গাড়ির হেডলাইটের আলো পড়ায় নম্বরটি স্পষ্ট দেখা যায় না। পরে ট্রাককে অনুসরণ করে ওই রোডেরই ২০০/২৫০ মিটারের মধ্যে যে সব সিসি ক্যামেরা আছে সেগুলোর ফুটেজ সংগ্রহ করেও একই অবস্থা দেখা গেছে। এর ফলে ঘাতক ট্রাকের নম্বর প্লেটের নম্বর পরিষ্কার হয়নি।

তবে পুলিশের এ বক্তব্য মানতে নারাজ নিহত অভিনেত্রীর বাবা আবুল কালাম। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, পুলিশ আমাদের সাহায্য করলেও ট্রাক শনাক্তের বিষয়ে এখনও কোনও সঠিক পদক্ষেপ নেয়নি। পুলিশ বারবার বলছেন, নম্বর প্লেটের ওপর আলো পড়ায় কিছু দেখতে পারেনি। আমরা বলেছি আপনারা শুধু একটা ভিডিওর ওপর নির্ভর না করে ওই সড়কের আরও সিসি ক্যামেরা ফলো করেন। কিন্তু পুলিশ ঘটনার তিন দিন পরও সেই প্রক্রিয়া শুরু করেনি বলে অভিযোগ করেন আবুল কালাম।

নিহত অভিনেত্রীর মামা দুলাল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা শুরু থেকে বাইকচালক শামীমকে সন্দেহ করেছি। কেননা, শামীম ১১টার পর থেকে রাত ২ পর্যন্ত কি করলো আশাকে নিয়ে। সে হিসাব মিললো না এখনও। পুলিশ যদি শামীমকে কারাগারে না পাঠিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতো, তাহলে এ ঘটনায় অনেক তথ্য বেরিয়ে আসতো। আমাদের মনে হয় তার মাধ্যমে ট্রাকচালককেও শনাক্ত করা সম্ভব।

পুলিশের তদন্ত সূত্র বলছে, ময়নাতদন্তের রিপোর্টের ওপর নির্ভর করছে শামীমের বিষয়। নিহতের পরিবারের ধারণা, ট্রাকের সঙ্গে ধাক্কা লাগার আগে আশাকে কিছু খাওয়ানো হতে পারে। যে কারণে সে বাইকের ওপর নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি। সেটা সঠিক কিনা, তার জন্য ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন প্রয়োজন। আমরা সেটার জন্য অপেক্ষা করছি। সেই প্রতিবেদনের ওপরও মামলার তদন্তের গতি অনেকটা নির্ভর করছে।

দারুসসালাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোফায়েল আহম্মেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। কিন্তু এখনও ট্রাকচালক বা ট্রাকটি শনাক্ত করতে পারিনি। গ্রেফতার শামীমের বিষয়ে ওসি বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ তাকে করা হয়েছে। তার কাছে আরও কিছু আছে এমন মনে হয়নি। তাই তাকে রিমান্ড আবেদন করা হয়নি।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দারুসসালাম থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) সোহান আহমেদ বলেন, মঙ্গলবার আশার বাবা আবু কালাম বাদী হয়ে মোটরসাইকেলের চালক শামীম আহমেদকে আসামি করে দারুসসালাম থানায় মামলা করেন। শামীম আহমেদ আশার পূর্বপরিচিত। সেদিন তিনি মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলেন। ঘটনার পর তাকে গ্রেফতার করা হয়। পরে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে পাঠানো হয়। শুনানি শেষে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

মামলায় যা বলা আছে
মামলায় অভিযোগ করা হয়, ছয়-সাত বছর ধরে আসামি শামীম আহমেদের সঙ্গে আশার পরিচয় ছিল। প্রায়ই শামীম আশাদের বাসায় যাতায়াত করতেন। আশার পরিবারও তাকে বিশ্বাস ও স্নেহ করতো। মাঝে মধ্যে এবং অভিনয়ের কাজে আসা-যাওয়ায় সহযোগিতা করতো শামীম। ৪ জানুয়ারি রাত ১১টার দিকে বনানী অফিস থেকে বের হওয়ার সময় আশা তার বাবাকে ফোন করে বলে, ‘আমি কিছুক্ষণের মধ্যে বাসায় আসছি।’ তারপর আবার ফোন করে তিনি বলেন, ‘বাড়ির কাজের বিষয়ে ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে কথা হয়েছে। কাজ নিয়ে কোনও সমস্যা হবে না। আমি শামীম ভাইয়ের সঙ্গে চলে আসবো।’ এ সময় শামীম মুঠোফোনে বলেন, আপনার মেয়ে যেভাবে বলে সেভাবে কাজ করেন, তাহলে ভালো হবে। পরে রাত পৌনে দুইটার দিকে শামীম ফোন করে জানায়, ‘আশা আর নেই। টেকনিক্যাল মোড়ে একটি অজ্ঞাত ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে মৃত্যুবরণ করেছে।’

মামলার এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, শামীম বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালিয়ে দুই ট্রাকের মাঝখান দিয়ে দ্রুতগতিতে যাওয়ার সময় সামনের ট্রাকের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। এতে আশা মোটরসাইকেলের পেছন থেকে ছিটকে পড়ে যান। এরপর পেছন থেকে দ্রুতগতিতে আসা একটি অজ্ঞাত ট্রাক চাপা দিলে মাথায় জখম হয়ে ঘটনাস্থলেই আশা মারা যান।

ভিডিওতে যা দেখা যায়
আশার দুর্ঘটনার সময় পেছনে থাকা একটি গাড়ির ভিডিওতে দেখা যায়, একটি পিকআপের পেছনে মোটরসাইকেলে মোড় ঘুরতে দাঁড়িয়ে ছিল তার বাইকটি। হঠাৎ দ্রুতগতির একটি ট্রাক আশার মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দিয়ে চলে যায়। ধাক্কা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আশার বাইকের রাইডার ডান দিকে আর আশা বামে পড়ে যায়। পরে ট্রাকটি তাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে মুখ থেঁতলে দেয়। বাইকচালক দৌড়ে আশার কাছে গেলেও ততক্ষণে সড়কে তার নিথর দেহ পড়ে আছে।

আশা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজির (বিইউবিটি) আইন বিভাগের ষষ্ঠ সেমিস্টারের শিক্ষার্থী ছিলেন।

আরও পড়ুন:
অভিনেত্রী আশা নিহতের ঘটনায় বাইকচালক আটক