গাড়িচালক যখন ছিনতাইকারী

এক চলচ্চিত্র নায়কের ব্যক্তিগত প্রাইভেটকার চালাতো সে। ওই নায়ককে তার অফিসে নামিয়ে দিয়ে, কিংবা পরিবারের সদস্যদের সুনির্দিষ্ট গন্তব্যে নামিয়ে দিয়ে এই গাড়িচালক বের হতো শিকার খুঁজতে। রাস্তাঘাটে পথচারী কারও হাতে ব্যাগ বা মোবাইলফোন দেখলেই তা ছোঁ মেরে  উধাও হয়ে যেত সে। অভিনব এই ছিনতাইকারীর নাম কামাল মিয়া।  মঙ্গলবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) উত্তরা এলাকা থেকে এই ছিনতাইকারীকে গ্রেফতর করেছে উত্তরা পূর্ব থানা পুলিশ। বুধবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) তাকে আদালতে সোপর্দ করে এক দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. শহীদুল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কামাল প্রাইভেটকার চালানোর ফাঁকে ফাঁকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাই করে বেড়াতো। তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তার সহযোগী কেউ আছে কিনা, তা জানার চেষ্টা চলছে।’

পুলিশ জানায়,গত রবিবার (১৪  ফেব্রুয়ারি) উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরের ৪ নম্বর সড়কের ১৮ নম্বর বাড়ির বাসিন্দা শিক্ষক শামীমা পারভিন এক সহকর্মীর বাসায় দাওয়াত খেতে গিয়েছিলেন। বিকাল সাড়ে পাঁচটার দিকে তিনি ও তার কয়েক সহকর্মী মিলে হেঁটে হেঁটে বাসায় ফিরছিলেন। তখন ওই সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় একটি প্রাইভেটকারের চালক চলন্ত অবস্থায় তার ব্যাগ ছোঁ মেরে নিয়ে যায়। শামীমা পারভিনের ব্যাগটি তার গলায়  ঝোলানো থাকায়, তিনিও গাড়ির সঙ্গে মাটিতে পড়ে ছেঁচড়ে যান। শামীমা প্রাইভেটকারের চাকার সঙ্গে বাড়ি খেয়ে ছিটকে পড়ে গেলে গাড়িটি দ্রুত চলে যায়। পরে অচেতন অবস্থায় শামীমা পারভিনকে উদ্ধার করে তার সহপাঠি ও স্বজনরা স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যান।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, বিষয়টি জানতে পেরে তারা ঘটনাস্থল উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরের ৪ নম্বর সড়কে গিয়ে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেন। ওই সিসিটিভি ফুটেজে একটি কালো গাড়ির চালককে শামীমা পারভীনের ব্যাগ ছোঁ মেরে নিয়ে যেতে দেখা যায়। পরে ওই গাড়ির নম্বর সংগ্রহ করা হয় এবং গাড়ির মালিককে খুঁজে বের করে চালক কামালকে গ্রেফতার করা হয়।

পুলিশ জানায়,প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে কামাল স্বীকার করেছে যে, সে মাঝে-মাঝেই তার গাড়ির মালিক বা পরিবারের সদস্যদের নির্দিষ্ট গন্তব্যে নামিয়ে দিয়ে অপেক্ষা করার বদলে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে ছিনতাইয়ের জন্য শিকার খুঁজতো। উত্তরা ছাড়াও রাজধানীর অন্যান্য এলাকায় গিয়ে এভাবে ছোঁ মেরে বিভিন্ন পথচারীর ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়েছে। ঘটনার দিন দুপুরের দিকে  সে  তার মালিককে বনানীর অফিসে পৌঁছে দিয়ে উত্তরায় এসে শামীমা পারভীনের ব্যাগ ছিনতাই করে। পরে আবার সে বনানী চলে যায়।

উত্তরা পূর্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কামাল উদ্দিন বলেন, ‘গ্রেফতার হওয়া কামাল স্ত্রী-সন্তান নিয়ে টঙ্গির আরিচপুরের মধুমিতা সড়কের একটি বাসায় ভাড়া থাকে। তার গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদির মশুয়া গ্রামে। উত্তরা থেকে আটকের পর তাকে নিয়ে তার বাসায় অভিযান চালানো হয়। বাসা থেকে শামীমার ছিনতাই হওয়া  দুটি মোবাইল ও ব্যাগে থাকা ৮০০ টাকার মধ্যে ২০০ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।’

ছিনতাইয়ের শিকার শামীমা পারভীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রাস্তা দিয়ে হেঁটে হেঁটে বাসায় ফিরছিলাম। সঙ্গে আমার কয়েকজন সহকর্মী ও আমার মেয়ে ছিল। আচমকা একটি প্রাইভেটকার থেকে আমার ভ্যানিটি ব্যাগটি টান দিয়ে নিয়ে যায়। ব্যাগটি টান দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাগের বেল্ট আমার হাতে আটকে যায়। এ কারণে ব্যাগের সঙ্গে সঙ্গে আমিও দৌড়াতে থাকি। এক পর্যায়ে গাড়িটি জোরে টান দিলে আমি মাটিতে পড়ে ছেঁচড়ে যাই। এরপর আমার আর কিছু মনে নেই।’

শামীমা পারভীন বলেন, ‘অল্পের জন্য আমার জীবন বেঁচে গেছে। কিন্তু আমি এখনও ঘুমাতে পারছি না। ট্রমার মধ্যে আছি। হাসপাতাল থেকে বাসায় এসেছি। পুলিশকে ধন্যবাদ, তারা দ্রুততার সঙ্গে ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করেছে।’

গাড়িটি ছিল চিত্রনায়ক সোহেল রানার

উত্তরার আলোচিত এই ছিনতাইয়ের ঘটনায় যে গাড়িটি ব্যবহার করা হয়েছে, সেই প্রাইভেটকারের মালিক  চিত্রনায়ক সোহেল রানা ওরফে মাসুদ পারভেজ। ঘটনার পর পুলিশ ওই গাড়িটি জব্দ করেছে। ছিনতাইকারী কামাল তিন বছর ধরে  সোহেল রানার ব্যক্তিগত এই গাড়িটি চালাতো বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে  জানতে চিত্রনায়ক সোহেল রানার মোবাইলে কল দিলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। আর তার ছেলে মাসরুর পারভেজের মোবাইলে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।