যেভাবে চোরাই গাড়ির সিন্ডিকেট চালাতেন ছাত্রলীগের উজ্জ্বল

কয়েকজন সহযোগী ও আটটি চোরাই গাড়িসহ হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মো. হৃদয় পাঠান ওরফে উজ্জ্বল পাঠানকে (২৯) গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। এই সিন্ডিকেট ঢাকা থেকে হবিগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নিয়ে বিক্রি করতো চোরাই গাড়ি। মাদক পরিবহনেও ব্যবহার করতো গাড়িগুলো। ডিবির হাতে গ্রেফতারের পর উজ্জ্বল পাঠানকে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

সম্প্রতি রাজধানীর কাফরুল থানার বিআরটিএ’র অফিসের সামনে থেকে একটি গাড়ি চুরি হয়। এ ঘটনায় ২১ জানুয়ারি কাফরুল থানায় মামলা হয়। মিরপুর বিভাগের সংঘবদ্ধ অপরাধ, গাড়ি চুরি প্রতিরোধ ও উদ্ধার টিম তদন্ত শুরু করে। কয়েকজন গাড়িচোর শনাক্তের পর তাদের গ্রেফতারে মাঠে নামে ডিবি। এরপর উজ্জ্বল সিন্ডিকেটের সন্ধান পাওয়া যায়।

একে একে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও হবিগঞ্জ জেলায় অভিযান চালিয়ে আটটি চোরাই গাড়িসহ উজ্জ্বলসহ চার জনকে গ্রেফতার করা হয়।

গ্রেফতারকৃতরা হলেন, মাধবপুর উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মো. হৃদয় পাঠান ওরফে উজ্জ্বল পাঠান, তার সহযোগী নূরুল হক, আব্দুল আলিম ওরফে ইমন ও এএইচ রুবেল। গ্রেফতারের সময় তাদের হেফাজত থেকে ৮টি চোরাই প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাস উদ্ধার করা হয়।

ডিবি সূত্র জানিয়েছে, গত ২৮ জানুয়ারি চোরাই প্রাইভেটকারসহ নূরুল হককে (২৪) গ্রেফতার করা হয়। ১২ মার্চ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিজয়নগর থানা এলাকা থেকে একটি চোরাই প্রাইভেটকার ও একটি মাইক্রোবাসসহ আব্দুল আলিম ওরফে ইমনকে (৩৩) গ্রেফতার করা হয়।

গ্রেফতারকৃতদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১৬ মার্চ হবিগঞ্জের মাধবপুর থেকে উজ্জ্বল পাঠান ও রুবেলকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় তাদের হেফাজতে থাকা পাঁচটি প্রাইভেটকার উদ্ধার করা হয়।

ঢাকার গাড়ি চোরদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল উজ্জ্বলের

ঢাকার গাড়িচোর চক্রটিকে গ্রেফতার করতে গিয়ে ডিবি পুলিশ জানতে পারে ছাত্রলীগ নেতা উজ্জ্বলের সঙ্গে গাড়িচোর নুরুল হক ও ইমনের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। ডিবির এক কর্মকর্তা জানান, ‘ঢাকা থেকে চক্রটি উজ্জ্বলের কাছে গাড়ি নিয়ে যেত। বিক্রির বিষয়টি উজ্জ্বল দেখতেন।’

সীমান্তে মাদক পরিবহনে চোরাই গাড়ি

ঢাকা থেকে চোরাই গাড়ি দ্রুত দেশের সীমান্ত এলাকার জেলাগুলোতে নিয়ে যায় চক্রটি। সেখানে নেওয়ার পর চেসিস নম্বর ঘষে অথবা কেটে পরিবর্তন করা হয়। ডিবির কর্মকর্তারা বলেন, ‘পুরনো মডেলের গাড়ি টার্গেট করতো চোরেরা। সেগুলো চুরি করে সীমান্ত এলাকায় নিয়ে কম দামে বিক্রি করতো। কখনও নিজেদের দখলে রেখে মাদক পরিবহনের কাজে ভাড়া দিতো। সীমান্ত থেকে মাদক এনে ভৈরব বা ঢাকার আশপাশের জেলায় পৌঁছে দিতো তারা।’

এ চক্রের সদস্যরা কিছু চোরাই গাড়ি দিয়ে সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে ইয়াবা, ফেনসিডিল ও গাঁজা বহন করে আসছিল। এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের চোরাকারবারের সাম্রাজ্যও গড়েছিল তারা।

‘মাস্টার কি’

২০০২ সালের আগের মডেলগুলোকে টার্গেট করতো বলে পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে তারা। এসব গাড়ি চুরি করতে যে চাবি তারা ব্যবহার করে সেটা এক ধরনের ‘মাস্টার কি’। ওটা দিয়ে মুহূর্তেই গাড়ি স্টার্ট দেওয়া যায়।

চুরির কাজে চক্রটি কয়েকটি ভাগে ভাগ হতো। চক্রের ২-৩ জনের একটি গ্রুপ আগে গাড়ি টার্গেট করতো। সুযোগ বুঝে সেই মাস্টার চাবি দিয়ে গাড়ির দরজা খুলে স্টার্ট দিয়েই ছুটে যেত নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার, পূর্বাচল বা কাঁচপুর সেতুর দিকে। সামনে-পেছনে মোটরসাইকেল বা অন্য কোনও গাড়িতে থাকতো চক্রের বাকিরা।

চক্রের মধ্যে যিনি দক্ষ চালক, তার কাজ হতো গাড়িটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ বা মৌলভীবাজারের চোরাই গাড়ি সিন্ডিকেটের কাছে পৌঁছে দেওয়া। সেখান থেকে অন্য আরেকজন গাড়িটি নিয়ে যেত সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকায়। বিআরটিএ’র সিল-স্বাক্ষর জাল করে মূল মালিকের নামের সঙ্গে মিল রেখে তৈরি হতো নকল কাগজ। মাঝে মাঝে বানানো হতো নিলামের জাল কাগজ। এরপর সরলমনা ক্রেতাদের ভুলিয়ে কম দামে বিক্রি করা হয় গাড়িটি।

উজ্জ্বল বহিষ্কার

উজ্জ্বল পাঠান গ্রেফতার হওয়ার পর ১৮ মার্চ কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ তাকে বহিষ্কার করে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেয়। তাতে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের স্বাক্ষর রয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, ‘শৃঙ্খলা পরিপন্থী কার্যকলাপে জড়িত থাকায় মাধবপুর উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হৃদয় পাঠান উজ্জ্বলকে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার করা হলো।’

এ প্রসঙ্গে মাধবপুর ছাত্রলীগের সভাপতি আনু মুহাম্মদ সুমন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘উজ্জ্বল রাতে গ্রেফতার হয়। পরদিন জেলা ছাত্রলীগ ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতাদের বিষয়টি জানাই। তাকে সংগঠন থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। গাড়ি চুরির বিষয়ে কিছু জানি না। তবে এলাকায় তার দুর্নাম আছে। বিভিন্ন সংস্থাও তার বিরুদ্ধে আমাকে জানিয়েছিল। আমি তাদের আগেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলাম।’

পুলিশের বক্তব্য

গাড়ি চুরির এই সিন্ডিকেটের সবাইকে এখনও গ্রেফতার করা যায়নি বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা-মিরপুর) মানস কুমার পোদ্দার। তিনি বলেন, ‘এরা সবাই একটাই চক্র। কিছু সদস্য এখনও বাইরে। নাম বললে তারা পালাবে।’