শুক্রবার ভোরে রাজধানীর যাত্রবাড়ীর মীরা হাজীরবাগ এলাকায় ডিএসসিসির ৫ নম্বর জোনের পরিচ্ছন্ন পরিদর্শক বিকাশ চন্দ্র সাহা যাত্রবাড়ী থানার ছিনতাই প্রতিরোধ টিমের পিটুনীতে গুরুতর আহত হয়েছেন। পরস্পর পরস্পরকে ছিনতাইকারী ভাবায় এমন ঘটনা ঘটেছে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। তবে পুলিশের পেশাদারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে পুলিশকে কেন মানুষ ছিনতাইকারী ভাববে?
বাংলা ট্রিবিউনের অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর পরিচ্ছন্ন কাজের তদারকির জন্য প্রতিদিনের মতো বিকাশ চন্দ্র দাস ভোর চারটায় বাসা থেকে বের হন। দয়াগঞ্জের বাসা থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে তিনি যাত্রাবাড়ীর মীর হাজিরবাগ এলাকায় পৌঁছলে যাত্রাবাড়ীর থানার সাদা পোশাকের টহল পুলিশ তাকে মোটরসাইকেল থামানোর সংকেত দেয়। তিনি সাদাপোশাকের পুলিশকে ছিনতাইকারী ভেবে মোটর সাইকেল ফেলে পেছনের দিকে দৌড় দেন। পুলিশও তাকে ছিনতাইকারী ভেবে ধাওয়া করে। বিকাশ দৌড়ে ৫০ গজ দূরে থাকা অন্য পরিচ্ছন্নকর্মীদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তার আগেই পুলিশ তার মাথায় বাড়ি দিয়ে রোড ডিভাইডারের ওপর ফেলে দেয়। এরপর পাঁচ পুলিশ সদস্য তাকে বুট দিয়ে লাথি দিতে থাকেন। বিকাশ তার পরিচয় জানানোর চেষ্টা করেন। অন্য পরিচ্ছন্নকর্মীরা দৌড়ে ঘটনাস্থলে আসেন। এরপর পুলিশ জানতে পারে বিকাশ সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা। এরইমধ্যে পরিচ্ছন্নকর্মীরা আবর্জনার গাড়ি দিয়ে সড়ক ব্যারিকেড দিয়ে পুলিশের গাড়ি আটকে ফেলে। তারা প্রতিবাদ করতে থাকে। এই ঘটনা সাদা পোশাকের পুলিশ থানায় জানালে আরও তিন পিকআপ পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। সিটি করপোরেশনের স্থানীয় কাউন্সিলর ও যাত্রাবাড়ী থানার ওসি অবনী শঙ্কর কর ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিচ্ছন্নকর্মীদের শান্ত করেন।
তবে, বিকাশের স্ত্রী স্বরস্বতী দাস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কোনও কারণ ছাড়াই পুলিশ আমার স্বামীকে মোটরসাইকেল থেকে নামিয়ে মারধর করে। হকিস্টিক, রোলার দিয়ে পিটিয়েছে। সড়কে ফেলে পাঁচ পুলিশ সদস্য তাকে বুট দিয়ে লাথি দিয়েছেন। মাথার পেছনে, কপালে ও নাকের ওপর লাঠি দিয়ে পিটিয়েছে। নাক ফেটে রক্ত পড়েছে। আমরা তাকে অবস্থায় উদ্ধার করে ট্যাক্সিক্যাবে করে হাসপাতালে নিয়ে এসেছি।’
শুক্রবার বিকেলে ঢামেক হাসপাতালের ২০১ নম্বর ওয়ার্ডের ১১ নম্বর বেডে গিয়ে দেখা গেছে, বিকাশ চন্দ্র সংজ্ঞাহীন শুয়ে আছেন। চিকিৎসকরা তাকে ৪৮ ঘণ্টার পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। পাশেই স্বজনরা কান্নকাটি করছিলেন।
বিকাশের স্ত্রী আরও বলেন, ‘ফজরের আজানের সময় আমার ভাইকে বিকাশ ফোন দেয়। আমার মা আমাকে ফোন দিয়ে যাত্রাবাড়ীতে যেতে বলেন। এরপর আমি যাত্রাবাড়ীতে আসি। আমরা খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি, বিকাশের নাক দিয়ে গড়গড়িয়ে রক্ত পড়ছে। একটি ময়লার ভ্যানের ওপর থাকে ফেলে রাখা হয়েছে। অন্য পরিচ্ছন্নকর্মীরা আবর্জনা সরানোর গাড়ি এনে সড়ক ব্যারিকেড দিয়ে পুলিশের গাড়ি আটকে রেখেছে। এরপর সেখানে আরও কয়েকটি পুলিশের গাড়ি আসে। যাত্রাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অবনী শঙ্কর কর আসেন। এরপর একটি ট্যাক্সিক্যাবে করে আমরা বিকাশকে হাসপাতালে নিয়ে আসি।’
স্বরস্বতী দাস বলেন, ‘আমরা এই ঘটনায় মামলা করব। এর বিচার চাই। পুলিশ বিনা অপরাধে কেন আমার স্বামীকে এভাবে মারধর করল?’
আহত বিকাশকে দেখতে ঢামেক হাসপাতালে ওসি অবনী শঙ্কর কর এসে তার স্বজনদের জানান, ‘বিকাশ আমার পরিচিত। বিষয়টি আমরা দেখব। দোষী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বিকাশের স্ত্রীর বড়ভাই চন্দ্রন দাস বলেন, ‘ঘটনাস্থলে থাকা পরিচ্ছন্নকর্মীরা জানিয়েছে, পুলিশ কোনও কিছু জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়াই তাকে মারধর করা হয়েছে। বিকাশের কোনও কথাই শোনেনি পুলিশ।’
এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপির) ওয়ারী জোনের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) নুরুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের ছিনতাই প্রতিরোধ টিম যাত্রবাড়ীতে পৌনে ৫ টার সময় টহলে ছিল। মোটরসাইকেলে ছিনতাই ঘটে। তাই মোটরসাইকেলটি দেখে তারা থামানোর জন্য সংকেত দেয়। কিন্তু ডিএসসিসির পরিদর্শক বিকাশ মোটারসাইকেলটি রেখে দৌড় দেন। এ সময় আমাদের পুলিশ সদস্যরা তাকে ধাওয়া করে লাঠি দিয়ে একটি বাড়ি দেন। তখন ডিভাইডারের ওপর পরে যান বিকাশ। এরপর বিকাশ তার পরিচয় দেন। তখন পুলিশ সদস্যরা তাকে স্যার বলে সম্মোধন করেন।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের পুলিশ মনে করেছে তিনি ছিনতাইকারী। বিকাশ মনে করেছেন, সাদাপোশাকের পুলিশ ছিনতাইকারী। তাই এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটেছে। এটা শুধু ভুল বোঝাবুঝি। ঘটনার পর ডিএসসিসির প্যানেল মেয়র, কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে এসেছিল। তাদের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে।’
এই ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে উল্লেখ করে ডিসি বলেন, ‘অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মাইনুল ইসলামের নেতৃত্ব একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে সহকারী পুলিশ কমিশনার মাকরুল ইসলামও রয়েছে। তারা বিষয়টি তদন্ত করে দেখবে। যদি আমাদের পুলিশের কোনও দোষ থাকে সেই অনুযায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
আহত বিকাশের বাবার নাম দিনেশ চন্দ্র দাস। রাজধানীর দয়াগঞ্জে তাদের নিজস্ববাড়ি। ১৫ বছর ধরে তিনি ঢাকা সিটি করপোরেশনে চাকরি করেন। দুই সন্তানের জনক বিকাশের ছেলের নাম নোবেল (৭), মেয়ের নাম প্রিয়া (৫)।
/এমএনএইচ/