বিতর্কিত ব্যবসায়ী মুসা বিন শমসেরকে (প্রিন্স মুসা) জিজ্ঞাসাবাদ করবে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। সচিব পরিচয়ে প্রতারণার অভিযোগে তিন সহযোগীসহ আব্দুল কাদের নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতারের পর তার সঙ্গে মুসা বিন শমসেরের যোগাযোগ ও লেনদেনের তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। ইতোমধ্যে মুসা বিন শমসেরকে মিন্টো রোডের গোয়েন্দা কার্যালয়ে হাজির হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের মাধ্যমে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার হারুন অর রশিদ বলেন, প্রতারক আব্দুল কাদেরের সঙ্গে মুসা বিন শমসেরের নানারকম ব্যবসায়িক সম্পর্কের চুক্তিপত্রসহ নানা তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেছে। এমনকি মুসা বিন শমসেরের একটি প্রতিষ্ঠানের পরামর্শক হিসেবেও কাজ করতো প্রতারক কাদের। তাদের মধ্যে কী সম্পর্ক এবং প্রতারণার সঙ্গে মুসা বিন শমসেরের কোনও সম্পৃক্ততা রয়েছে কিনা- তা জানতেই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা- এনএসআইয়ের সহযোগিতায় গত ৭ অক্টোবর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে আব্দুল কাদেরসহ চার প্রতারককে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা গুলশান বিভাগ। তারা হলো- আব্দুল কাদের চৌধুরী, শারমীন চৌধুরী ছোঁয়া, শহিদুল আলম ও আনিসুর রহমান।
এসময় তাদের হেফাজত থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগজিন ও এক রাউন্ড গুলিসহ একটি ওয়াকিটকি, একটি প্রাডো গাড়ি, অতিরিক্ত সচিবের অফিসিয়াল আইডি কার্ড, ভিজিটিং কার্ডসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে রাজধানীর পল্লবী থানায় একটি অস্ত্র মামলা ও তেজগাঁও থানায় একটি প্রতারণা মামলা দায়ের করা হয়েছে। দুটি মামলায় সাত দিনের রিমান্ডে নিয়ে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে গোয়েন্দা পুলিশ।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, আব্দুল কাদের চৌধুরীর শিক্ষাগত যোগ্যতা নবম শ্রেণি পর্যন্ত। কিন্তু তিনি অতিরিক্ত সচিব হিসেবে পরিচয় দিয়ে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করতেন। রাজধানীর গুলশানের জব্বার টাওয়ারে তার একটি কার্যালয় রয়েছে। সেখানে বসেই তিনি বিভিন্ন ব্যাংকের ঋণ পাইয়ে দেওয়ার নামে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আছিলেন। তার সঙ্গে দেখা করানোর জন্যই সহযোগীরা ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত টাকা নিতেন।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, আব্দুল কাদের চৌধুরী ‘ঢাকা ট্রেড করপোরেশন’, ‘জমিদার ট্রেডিং’, ‘সামীন এন্টারপ্রাইজ’, ‘চৌধুরী গ্রুপ’, ‘হিউম্যান ইম্প্রুভমেন্ট ফাউন্ডেশন’, ‘সততা প্রোপার্টিজ’, ‘ডানা লজিস্টিকস’, ‘ডানা মটর্স’ ইত্যাদি নামে নামস্বর্বস্ব প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কথা বলেই তিনি মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে থাকেন। ২০০৪-২০০৬ সালে তিনি সরকারি বাড়ি বরাদ্দ দেওয়ার নামে সারাদেশের বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, আব্দুল কাদের সরকারের বড় বড় বিভিন্ন প্রকল্প ও সেনাবাহিনীর প্রকল্পগুলোর ভুয়া ওয়ার্ক অর্ডার নিজের প্রতিষ্ঠানের নামে বানিয়ে দেখাতো- যাতে করে মানুষ তাকে বড় ঠিকাদার বা ব্যবসায়ী হিসেবে মনে করে। এছাড়াও তার প্রতিষ্ঠানে মুসা বিন শমসেরের সঙ্গে একাধিক ছবি টাঙানো ও মুসা বিন শমসেরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অ্যাডভাইজার হিসেবে পরিচয় দিয়ে টাকা-পয়সা নিয়ে কোনও সমস্যা হবে না বলে পরিচয় দিতো।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রতারক আব্দুল কাদের চৌধুরীর কাছ থেকে মুসা বিন শমসের ও তার স্ত্রীর সঙ্গে করা কিছু চুক্তিপত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া মুসা বিন শমসেরের সঙ্গে ২০ কোটি টাকা লেনদেনের কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। কিসের ভিত্তিতে এসব লেনদেন করা হয়েছে তা জানতেই মূলত মুসা বিন শমসেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
গোয়েন্দা পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার মশিউর রহমান বলেন, ‘মুসা বিন শমসেরের সকল সম্পদের লিগ্যাল অ্যাডভাইজার হিসেবে পরিচয় দিতো আব্দুল কাদের। এছাড়া তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও চুক্তিপত্রসহ অনেক তথ্য-উপাত্ত উদ্ধার করা হয়েছে। এজন্যই মামলার তদন্তের প্রয়োজনেই মুসা বিন শমসেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’