নিহত চালকের কললিস্টে ‘মাদক ব্যবসায়ীর’ সঙ্গে কথোপকথন

রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় সড়কে পড়ে থাকা গাড়িতে উদ্ধারকৃত নিহত চালকের মোবাইলে মাদক সরবরাহকারী এক ব্যক্তির সঙ্গে কথোপকথনের প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ। ধারণা করা হচ্ছে, নিহত গাড়িচালক সজল কুমার ঘোষ (৩০) মহাখালীতে গাড়ি পার্কিং করতে যাওয়ার সময় তেজগাঁওয়ে বসে মাদক সেবন করেছিলেন। ওই ব্যক্তি একজন মাদক ব্যবসায়ী এবং সজলের পূর্ব পরিচিত। ওই ব্যক্তিকে গ্রেফতার করতে পারলেই এই রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব বলে মনে করছে পুলিশ।

ইতোমধ্যে নিহত গাড়িচালকের কললিস্ট যাচাই করে ওই মাদক সরবরাহকারীকে শনাক্ত করেছে পুলিশ। গাড়িচালকের মোবাইলে অটো-কলরেকর্ড অ্যাপস থাকায় ওই মাদক ব্যবসায়ীর সঙ্গে যে কথোপকথন হয়েছে, তা পুলিশ উদ্ধার করেছে। তেজগাঁও এলাকায় ঢুকে ওই ব্যক্তির সঙ্গেই কথা বলেছেন গাড়িচালক সজল। ওই ব্যক্তি মাদক সরবরাহকারী বলেই পুলিশ প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে। ওই ব্যক্তিকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তদন্ত-সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সজল কুমার ঘোষ ধানমন্ডির এক ব্যবসায়ীর ব্যক্তিগত গাড়িচালক ছিলেন। ৭ অক্টোবর বিকাল ৩টার দিকে টয়োটা ফরচুনা (ঢাকা মেট্রো ঘ-১১-৭৯৮৬) গাড়িতে করে মহাখালী থেকে মালিককে নিয়ে ধানমন্ডিতে তার বাসায় নামিয়ে দেন। ধানমন্ডি থেকে চালক ফের গাড়িটি নিয়ে মহাখালীর ১০ তলা নাভানা টাওয়ারে পার্কিং করার জন্য রওনা হন। তবে ওইদিন বিকালে চালক নাভানা টাওয়ারে গাড়িটি পার্কিং করেননি। চালককে ফোন দিয়েও আর পাওয়া যাচ্ছিল না। অনেক জায়গায় খোঁজ নিয়েও মালিক তার হদিস পাচ্ছিলেন না। পরে ৯ অক্টোবর তিনি ধানমন্ডি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। জিডি নম্বর ৫৪৯।

৯ অক্টোবর রাতে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার ৩৩৯/এ টিপারা আয়রন অ্যান্ড টিন ফ্যাক্টরি লিমিটেডের সামনে পাকা সড়কে টয়োটা গাড়িটি পড়েছিল। গাড়ির পেছনের সিটে চালকের অর্ধগলিত লাশ ছিল। তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার পুলিশ তার লাশ উদ্ধার এবং সুরতহাল তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়।

এ ঘটনায় নিহতের ছোট ভাই আলয় কুমার ঘোষ বাদী হয়ে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেন।

মামলাটি তদন্ত করছে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা পুলিশ। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সজল ধানমন্ডি থেকে গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য মহাখালীর দিকই যাচ্ছিলেন। তার গাড়িটি মহাখালীর দিকেই মুখ করা ছিল। কিন্তু তিনি তেজগাঁওয়ে প্রবেশ করে গাড়িটি নিয়ে দাঁড়ান। এ সময় এক ব্যক্তির সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেন। ওই ব্যক্তির সঙ্গে যে কথোপকথন হয়েছে, তাতে মাদক সংক্রান্ত কথাবার্তা রয়েছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, সজল যার সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেছিলেন, তাকে শনাক্তের পর নজরদারিতে রাখা হয়েছে। খুব শিগগিরই তাকে গ্রেফতার করা হবে।’

সজলের ফোনসেটে অটো কলরেকর্ড অ্যাপ থাকায় ওই ব্যক্তির কথোপকথন পুলিশের হাতে রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তাদের একজন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) সাহেদুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মামলার তদন্ত চলছে। কীভাবে সজলের মৃত্যু হয়েছে তা এখনও নিশ্চিত নয়। আমরা ময়নাতদন্ত রিপোর্ট হাতে পেলে বিস্তারিত জানতে পারবো। আমরা জানতে পেরেছি, তিনি গাড়ি পার্কিং করতে মহাখালী যাচ্ছিলেন। যাওয়ার সময় তিনি কেন গাড়ি নিয়ে তেজগাঁও দাঁড়িয়েছিলেন, তা আমরা খতিয়ে দেখছি।’

তিনি বলেন, ‘ওই এলাকার সিসি ক্যামেরার ফুটেজসহ সবকিছু নিয়েই আমরা তদন্ত করছি।’

নিহত সজলের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার ধনপুর এলাকায়। তার বাবার নাম সুবল কুমার ঘোষ। রাজধানীর ভাটারা এলাকায় তার ভাই, স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকতেন তিনি।

তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে প্রায় তিনদিন গাড়ির ভেতরে মৃত অবস্থায় পড়ে ছিল সজলের লাশ। গাড়ি থেকে দুর্গন্ধ ছড়ালে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেয়। পরে পুলিশ এসে লাশ উদ্ধার করে। সজলের শরীরে কোনও জামাকাপড় ছিল না। পুলিশের ধারণা, অতিরিক্ত মাদক সেবনের পর পরিচিত কেউ তাকে পরিকল্পনা করে হত্যা করতে পারে।

অথবা অতিরিক্ত মাদক সেবন বা যৌন উত্তেজক ওষুধ খাওয়ার ফলে অসুস্থ হয়ে তার মৃত্যু হতে পারে। তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্ত চিকিৎসক তার পাকস্থলি থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছে। কোন বিষাক্ত কিছু থাকলে ময়নাতদন্তে রিপোর্টে তা চলে আসবে।

তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী আবুল কালাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই ঘটনাটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আমরা তদন্ত করছি। চালকের মৃত্যুরহস্য শিগগিরই উদঘাটন হবে বলে আশা করছি। আমরা কাজ করছি।’