নিউ কলোনি উচ্ছেদ: অতীতের সব বর্বরতাকে হার মানিয়েছে ওরা!

আসাদ গেইট নিউ কলোনি ভাঙার পরের ছবিসারারাত মাঠেই বসেছিলাম, খাওয়া নেই, টেনশন, ক্লান্তি আর ক্ষোভে এখনও আচ্ছন্ন হয়ে আছি। বৃদ্ধ শাশুড়ি আর কলেজ পড়ুয়া মেয়েকে পাঠিয়েছি বন্ধুর বাসায়। শশুর আর ছেলেকে নিয়ে মাঠেই বসেছিলাম। চোখের সামনে দেখেছি কিভাবে এতদিনের আগলে রাখা বাসাকে ভেঙেচুরে গুঁড়ো করে দেওয়া হলো। কিছুই করতে পারলাম না, চোখের জলে চেয়ে-চেয়ে দেখলাম শুধু। এরপর সকাল বেলায় ছেলেটার কষ্ট সইতে না পেরে চলে এলাম নারায়ণগঞ্জে ভাইয়ের বাসায়। মোবাইল ফোনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নিউ কলোনির একজন সাবেক বাসিন্দা এভাবেই কথাগুলো বললেন।
জিয়াউল  হক নামের  ৭৫ বছর বয়সী আরেকজনও সারারাত মাঠে ছিলেন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে। সকালের দিকে তিনি কোথায় যে চলে গেছেন, কেউ জানে না বলে জানালেন কলোনির আরেক বাসিন্দা সাইফুল মাসুম।
বুধবার (২০ জানুয়ারি) মোহাম্মদপুরের নিউ কলোনিতে গিয়ে সরেজমিনে দেখা যায়, পুরো এলাকা সুনসান। কোথাও কেউ নেই। ভুতুড়ে একটা পরিবেশ। সবাই যার যার ঘরে চুপচাপ বসে আছেন। যেন বাইরের দুনিয়াটা তাদের নয়, তাদের জন্য নয়। আর মঙ্গলবার ভাঙা শুরু করা বাসাগুলোর ভেতরে গিয়ে দেখা গেল, অন্ধকার ঘরের মেঝেতে পড়ে রয়েছে ইট, দেয়ালের পলেস্তারার টুকরো, বাসার ভেতরে নানা ইলেকট্রিক ক্যাবল, সামনের গাছগুলোও কেটে ফেলেছেন তারা।

বেলা সাড়ে বারোটায় নিউ কলোনিতে গিয়ে দেখা গেল, মঙ্গলবার এই সময়ে যে মাঠে ছিল মালামালের স্তূপ, পাশের রাস্তাটা ছিল ভ্যান, ট্রাক আর লোকে লোকারণ্য সেই মাঠে বাজার বসেছে। সবজি, মাছ মুরগিসহ বিভিন্ন পসরা সাজিয়ে বসেছে ক্ষুদে ব্যবসায়ীরা। সেখানেই দেখা হলো কলোনির পরিচিত একজনের সঙ্গে। দাঁড়িয়ে কথা বলতে ভয় পেয়ে বললেন, চলেন ঘরে যাই। ওরা আবার দেখে ফেলবে। ওরা মানুষ না, মানুষ হলে এত অমানবিক কাজ করতে পারে না। চারিদিকে তাকাতে তাকাতে দ্রুত পা বাড়ালাম। চলে এলাম তিনতলায়। সেখানেই কথা হলো বাড়ির কর্তা এক সময়ের ডাকসাইটে সাংবাদিকের সঙ্গে। বয়সের ভারে আর শারীরিক অসুস্থতার কারণে যিনি বিছানায় শোয়া। নিরাপত্তার কারণে তার নামটিও প্রকাশ করা হলো না। তিনি বলেন, এই দিনটা দেখার জন্যই বোধ হয় বেঁচেছিলাম। মাসুদ আর মিজানের গুন্ডা বাহিনীর কাছে আমরা হেরে গেলাম। অন্যায়ের কাছে ন্যায়ের পরাজয় হলো।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী জানালেন, গতকাল ওরা যখন উচ্ছেদ করতে এলো, আমাদের ঢুকতেই দিচ্ছিল না। আমাকে ঢুকতে দিন। তাদের কত অনুরোধ করলাম, আপনারা একটা ঘণ্টা সময় দেন, এ রকম অমানবিক কাজ করবেন না। কিছুতেই দিল না, কি আর্তচিৎকার তাদের! শাবল দিয়ে ভেঙে দিচ্ছে। পুলিশ নীরব ছিল, ভাঙার কাজ তো করেছে গুন্ডা-মাস্তানরা, হাউজিংয়ের কিছু লোক ও গুন্ডা বাহিনী এই কাজটা করল। ভেতরে মানুষ। অথচ ওরা ঠাসঠাস পেটাচ্ছে। আমরা বয়োজেষ্ঠ্যরা কত বললাম, তোমরা থামো, কিন্তু ওরা শুনলো না। চুলায় তখন রান্না চলছে। অথচ ওরা এসে গ্যাস বন্ধ করে দিল। ভাঙতে এসছে ওরা। হীরার এক শোকেস কাচের জিনিস ভেঙে ফেলেছে, লুট করেছে, একবাসা থেকে বঙ্গবন্ধুর ছবিকে ছুড়ে মারল। আমি শুধু ভাবছিলাম, কত কোটি টাকা খেয়ে ওরা আসছে। মানুষ যদি কোথাও এত বছর থাকে, সেখানে নিজের বাড়ির চেয়েও বড় মায়া হয়ে যায়। আমরা এখানে ৪০-৫০ বছর ধরে আছি। আমাদের কি কোনও অধিকার নেই। আমি এটাও বলেছি, মাসুদ বারীরা কেন এসে দাঁড়াচ্ছেন না। কেন আমাদের একঘণ্টাও সময় দিল না। তারাও তো কলোনিরই লোক।

আসাদ গেইট নিউ কলোনি ভাঙার পরের ছবি ১

জানা গেল, কলোনির যারা প্রতিবাদী কণ্ঠ হিসেবে পরিচিত এমন কয়েকজনের নামে সরকারি কাজে বাধা দিচ্ছে। এমন অভিযোগে মামলা করা হয়েছে মোহাম্মদপুর থানায়। তারা হলেন, কলোনির বয়োজেষ্ঠ্য ঝর্ণা, রেবা, রানু, রোজি আর মনোয়ার, ফারুক, আলমগীর, পলাশ, জুলফিকার, সোহেল, বিপ্লব, রাজিব, সজীব ও রাসেল। তারা এখন প্রাণের ভয়ে আত্মগোপনে রয়েছেন। গত ২৭ ডিসেম্বর প্রথম বাদশা এবং বাদশা বাহিনী যখন প্রথম ঘর ভাঙতে  এলো, তখন তাদের সঙ্গে তর্ক হয় যে, ওরাতো বাসা ভাঙতে পারে না। কারণ তখন উচ্চ আদালতের স্থগিত আদেশ ছিল তিনমাসের। ১০ থেকে ১২ টি হোন্ডায় করে প্রতিটি হোন্ডায় তিনজন করে হাতে লাঠি নিয়ে এসেছে। মুহূর্তেই তারা আক্রমণ করে। নারীদের গায়ে হাত দিয়েছে, গলার চেইন ছিনিয়ে নিয়েছে, মাথায় বাড়ি দিয়েছে, কাউকে গলা ধরে ছুড়ে ফেলেছে। অত্যাচার কাকে বলে, সেটা সেদিন দেখেছি। অর্থমন্ত্রণালয়ের এই সাবেক কর্মচারী বলেন, আমাদের ওপর কেন এ বর্বরতা? আমরা কি মানুষ নই? তিনি বলেন, হাউজিংয়ের মুষ্টিমেয় দুর্নীতিবাজ কিছু মানুষ আর স্থানীয় আওয়ামী লীগের ক্যাডার এবং আওয়ামী লীগ নেতা মাসুদ বারীর যোগসাজশে এ ঘটনা ঘটেছে।গতকাল যিনি এই উচ্ছেদের নেতৃত্ব দিয়েছেন, সেই বাদশা হলেন মিজানের ডান হাত।

উল্লেখ্য, মঙ্গলবার (১৯জানুয়ারি) হাইকোর্টের স্থগিত আদেশ অমান্য করে মোহাম্মদপুরের লালমাটিয়া মাঠের পাশের নিউ কলোনির পুরাতন সাতটি ভবনের ৯, ১৩ এবং ১৫ নম্বর ভবন থেকে বাসিন্দাদের উচ্ছেদ করা হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ এই উচ্ছেদ কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা। পুরনো সাত ভবনে ভাষা সৈনিক, মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিকসহ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের ১১৪টি পরিবার এতদিন ধরে বসবাস করছেন। তাদের সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ৩০ বছর ভাড়া দিয়ে এলে নিউ কলোনির এই ফ্ল্যাটগুলো তাদের নামে দিয়ে দেওয়া হবে। সে অনুযায়ী বাসিন্দারা ভাড়াও পরিশোধ করে আসছিলেন। এখন বলা হচ্ছে, এখানে সরকারি সুউচ্চ ভবন হবে এবং এখানে নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের ফ্ল্যাট কিনে নিতে হবে।

/এমএনএইচ/