আজ সাবেক অর্থমন্ত্রী কিবরিয়া হত্যাকাণ্ডের ১১ বছর

কিবরিয়া হত্যা মামলাআজ বুধবার (২৭ জানুয়ারি) সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যাকাণ্ডের ১১তম বর্ষপূর্তি। দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে আওয়ামী লীগ ও কিবরিয়া স্মৃতিপরিষদ। ২০০৫ সালের এ দিন হবিগঞ্জ সদর উপজেলা বৈদ্যের বাজারে গ্রেনেড হামলায় কিবরিয়াসহ ৫ জন নিহত হন। এ ঘটনায় আহত হন শতাধিক লোক। হত্যাকাণ্ডের সাড়ে ৯ বছর পর ২০১৪ সালের ১৩ নভেম্বর সম্পূরক চার্জশিট দাখিলের মাধ্যমে বিচার কাজ শুরু হয়েছে। হবিগঞ্জবাসীর প্রত্যাশা এ সরকারের আমলেই এ হত্যাকাণ্ডের বিচার কাজ শেষ হবে।
২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি বিকেলে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার বৈদ্যের বাজারে ঈদ পরবর্তী এক জনসভায় শেষে ফেরার পথে গ্রেনেড হামলায় নিহত হন সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া। হামলায় নিহত হন শাহ এএমএস কিবরিয়ার ভাতিজা শাহ মনজুরুল হুদা, আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রহিম, আবুল হোসেন ও সিদ্দিক আলী। আহত হন শতাধিক নেতাকর্মী।
এ ঘটনার রাতেই হবিগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও বর্তমান সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুল মজিদ খান এমপি বাদী হয়ে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্তে কাজ করে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা। কিন্তু মামলাটির স্বাভাবিক তদন্ত না হয়ে দলীয় বিবেচনায় পরিচালিত হতে থাকে।
সিআইডির তৎকালীন সহকারী পুলিশ সুপার মুন্সী আতিকুর রহমান মামলাটি তদন্ত করে ১০ জনের বিরুদ্ধে ওই বছরের ২০ মার্চ ১ম অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
অভিযোগপত্র দেওয়ার পর মামলার বাদী অ্যাডভোকেট আবদুল মজিদ খান ২০০৬ সালের ৩ মে সিলেট দ্রুত বিচার আদালতে না-রাজি আবেদন করেন। আদালত তার আবেদন খারিজ করলে ১৪ মে তিনি হাইকোর্টে আপিল করেন। আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ সরকারের প্রতি ‘কেন অধিকতর তদন্ত করা যাবে না’ মর্মে রুল জারি করেন। এই রুলের বিরুদ্ধে ২০০৬ সালের ১৮ মে লিভ টু আপিল করে সরকার। আপিল বিভাগ সরকারের আপিল খারিজ করেন। এরপর ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এ মামলার অধিকতর তদন্ত শুরু হয়। দায়িত্ব দেওয়া হয় সিআইডি’র সহকারী পুলিশ সুপার রফিকুল ইসলামকে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে তিনি ২০১১ সালের ২০ জুন আরও ১৪ জনকে আসামি করে এই আলোচিত মামলার অধিকতর তদন্তের অভিযোগপত্র দাখিল করেন। কিবরিয়া হত্যাকাণ্ডের সাড়ে ৬ বছর পর লুৎফুজ্জামান বাবর, মুফতি হান্নানসহ ২৪ জনকে আসামি করে অধিকতর তদন্তের অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছিল।

২০১১ সালের ২৮ জুন কিবরিয়ার স্ত্রী আসমা কিবরিয়া চার্জশিটের ওপর হবিগঞ্জ জুডিশিয়াল আদালতে না-রাজি দেন। ওই না-রাজির পরিপ্রেক্ষিতে মামলার মূল নথি সিলেট দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালে থাকায় বিচারক রাজিব কুমার বিশ্বাস উপনথির মাধ্যমে আবেদনটি সিলেটে পাঠানোর নির্দেশ দেন। ২০১২ সালের ৫ জানুয়ারি হত্যাকাণ্ডের  অধিকতর তদন্তের অভিযোগপত্রের না-রাজি আবেদন গ্রহণ করেন সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক দিলীপ কুমার বণিক। তিনি সিনিয়র পুলিশ অফিসারের মাধ্যমে মামলার অধিকতর তদন্তের জন্য নির্দেশ দেন।

এরপর সিআইডির এএসপি মেহেরুন নেছা দীর্ঘ তদন্ত শেষে সাড়ে ৯ বছর পর ২০১৪ সালের ১৩ নভেম্বর হবিগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রোকেয়া আক্তারের আদালতে নতুন ১১ জনকে অন্তর্ভুক্ত করে ৩৫ জনের বিরুদ্ধে ৩য় সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করেন। নতুন অন্তর্ভুক্ত আসামিরা হলেন সিলেট সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, হবিগঞ্জ পৌর মেয়র জি কে গউছ, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক উপদেষ্টা হারিছ চৌধুরী, মুফতি আব্দুল হাই, মুফতি তাজ উদ্দিন, মুফতি সফিকুর রহমান, মোহাম্মদ আলী, বদরুল, মহিবুর রহমান, কাজল আহমেদ, হাফেজ ইয়াহিয়া। একই সঙ্গে আগের  চার্জশিটভুক্ত ইউসুফ বিন শরীফ, আবু বক্কর আব্দুল করিম ও মরহুম আহছান উল্লাহকে চার্জশিট থেকে অব্যাহতির আবেদন করেন।

এর পর ২০১৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর আদালতে আত্মসমর্পণ করেন হবিগঞ্জ পৌর মেয়র জি কে গউছ। এর দু’দিন পর ৩০ ডিসেম্বর একই আদালতে আত্মসমর্পণ করেন সিলেট সিটি করপোরেশন মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী।

এর পর ২০১৫ সালের জুনে মামলাটি সিলেট দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে হস্তান্তর করা হয়। এর পর থেকে সেখানে বিচার কার্য শুরু হয়েছে। মামলার ১৫জন সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি মামলাটি স্থগিতের জন্য রাষ্ট্রপক্ষ আইন মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন।

নিহতের আত্মীয় স্বজনরা দাবি করছেন জানান এ সরকারের আমলে কিবরিয়া হত্যার বিচার কাজ শেষ না হলে আর বিচার হবে না। এটি দেশের জন্য কলঙ্ক হয়ে থাকবে। 

মামলার বাদী ও হবিগঞ্জ-২ আসনের এমপি এম এ মজিদ খান জানান, দীর্ঘদিন পর হলেও বিচার কাজ চলছে। ইতোমধ্যে আমিসহ ১৫ জন সাক্ষ্য দেওয়া হয়েছে। আশা করি প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে এ সরকারের আমলেই বিচর কার্য শেষ হবে। হবিগঞ্জ তথা দেশবাসী বিচার দেখতে পাবে। 

জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও হবিগঞ্জ-৩ আসনের এমপি অ্যাডভোকেট আবু জাহির বলেন, বিগত জোট সরকারের উদ্দেশ্যই ছিল আওয়ামী লীগের  নেতাকর্মীদের হত্যা করে দলকে ধ্বংস করা। সেই লক্ষ্যেই কিবরিয়াসহ ৫ জনকে হত্যা করা হয়েছে। প্রায় ১০ বছর পর বিচার কাজ শুরু হয়েছে। আশা করি, দ্রুত সময়েই বিচার কাজ শেষ করে দোষীদের সাজা হবে।

মামলার পাবলিক প্রসিকিউটর এম আকবর হোসেন জিতু জানান, হত্যা মামলাটি সিলেট ও বিস্ফোরক মামলাটি হবিগঞ্জ আদালতে বিচারাধীন। সাক্ষ্য  গ্রহণ চলছে। সরকার দ্রুত সময়ের মধ্যেই কিবরিয়াসহ ৫ হত্যাকাণ্ডের  বিচার কাজ শেষ হবে।

/এমএনএইচ/