জঙ্গি তৎপরতা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাটির ওয়েবসাইটের খবরে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে শ্রী শ্রী সন্তগৌরীয় মঠের অধ্যক্ষ যজ্ঞেশ্বর রায়কে হত্যার দাবি জানিয়েছে দি ইসলামিক স্টেট।’
রবিবার সকালে হত্যাকাণ্ডের পর রাতে আইএসের দায় স্বীকারের এই খবর প্রকাশ করলো সাইটটি।
এদিকে আমাদের পঞ্চগড় প্রতিনিধি জানিয়েছেন, পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে শ্রী শ্রী সন্ত গৌড়ীয় মঠের অধ্যক্ষ যগেশ্বর রায় (৫০) হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জঙ্গিদের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলে ধারণা করছে পুলিশ ও স্থানীয়রা। তারা বলছেন, হত্যাকাণ্ডের মোটিভ ও হত্যাকারীদের পালিয়ে যাওয়ার ধরন দেশের অন্যান্য এলাকায় সংঘটিত ঘটনার মতোই।
এরইমধ্যে পুলিশের রংপুর রেঞ্জের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. হুমায়ূন কবির, র্যা ব, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেসটিগেশন (পিবিআই) ও ক্রাইম ইনভেসটিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি)সহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। ঘটনাস্থল থেকে কালো টেপ দিয়ে মোড়ানো এবং মার্কার কলম দিয়ে ইংরেজিতে আইএস লেখা একটি অবিস্ফোরিত ককটেলও উদ্ধার করেছে পুলিশ। বর্তমানে আলামত সংগ্রহ করে বর্তমানে ঘটনাস্থলটি ঘিরে রেখেছে পুলিশ।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা দেবীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) আইয়ুব আলী বলেন, এটা জঙ্গিদের কাজ বলে প্রাথমিকভাবে ধারাণা করা হচ্ছে। ঘটনাস্থল থেকে দুর্বৃত্তদের ফেলে যাওয়া একটি রক্তমাখা জ্যাকেট ও একটি চাপাতি, একটি পিস্তলের গুলি এবং একটি তাজা গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশ সুপার গিয়াস উদ্দিন আহাম্মদ বলেন, জেলার সব হিন্দু ধর্মশালায় নিরাপত্তা জোরদার ছিল। কারা হত্যাকারী এবং কী কারণে এমন হলো তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত না করে কোনও কিছু বলা যাচ্ছে না। তিনি আরও জানান, প্রত্যেকটি মন্দির মসজিদে পুলিশ পাহারা ছিল। কিন্তু একুশে ফেব্রুয়ারির কারণে আজ কোনও পুলিশ ছিল না।
পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন জানান, এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। দোষীদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।
পঞ্চগড়-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম সুজন জানান, দেশের অন্যান্য এলাকায় যেভাবে হামলা করা হয়েছে, হত্যা করা হয়েছে এখানকার ঘটনাও তেমনি। এটা জঙ্গি সংগঠনগুলোর কাজ। সরকার জঙ্গি দমনে তৎপর রয়েছে। পুলিশ প্রশাসন এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনতে পারবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
এদিকে যগেশ্বর রায়ের মরদেহ ময়নাতদন্তের পর মঠ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেছে পুলিশ। মঠের পাশে করতোয়া নদীর শ্বশানে রবিবার বিকাল পৌনে পাঁচটার দিকে তার লাশ দাহ করা হয়। সেখানে তার স্বজন ও ভক্তরা উপস্থিত ছিলেন।
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করতে পারেননি বলে জানিয়েছেন দেবীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ বাবুল আখতার। তবে এ ঘটনায় দেবীগঞ্জ থানায় একটি অস্ত্র ও হত্যা মামলা হয়েছে বলে তিনি জানান।
এর আগে রবিবার সকাল ৭টার দিকে শ্রী শ্রী সন্ত গৌড়ীয় মঠের অধ্যক্ষ যগেশ্বর রায়কে গলা কেটে হত্যা করে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা। এ সময় দুর্বৃত্তদের ছোড়া গুলিতে মারাত্মক আহত হন গোপাল চন্দ্র রায় (৩৫) নামে আরেক সাধু। ককটেল নিক্ষেপে আহত হয়েছেন মঠের পাশ্ববর্তী এলাকার নিতাই পদ দাস (৪০) নামে এক ব্যক্তি। গুলিবিদ্ধ পুরোহিত গোপাল চন্দ্র রায়কে রংপুর মেডিক্যাল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
ঘটনার পরপরই স্থানীয় সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
অধ্যক্ষকে হত্যার প্রতিবাদে এদিন দুপরে এলাকাবাসী দেবীগঞ্জ-পঞ্চগড় সড়ক অবরোধ করে। পুলিশের রংপুর রেঞ্জের উপ-মহাপরিচালক মো. হুমায়ূন কবীরের আশ্বাসের প্রেক্ষিতে ৩০ মিনিট পর অবরোধ তুলে নেওয়া হয়।
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, জেলার দেবীগঞ্জ উপজেলা সদরের করতোয়া নদীর পশ্চিম পাশে অবস্থিত শ্রী শ্রী সন্ত গৌড়ীয় মঠ। সকালে ওই মঠের পুরোহিতসহ তিন সাধু পুজো অর্চনা করছিলেন। এ সময় দুর্বৃত্তরা ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করলে পুরোহিত যগেশ্বর রায়সহ অন্যরা মঠ থেকে বেরিয়ে আসেন। দুবৃত্তদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো অস্ত্র দেখে অধ্যক্ষ মঠ থেকে বের হয়ে ঘরের দিকে দৌড় দেন। কিন্তু ঘরে পৌঁছানোর আগেই বারান্দায় চাপাতি দিয়ে তাকে গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ সময় মঠোর আরেক পুরোহিত গোপাল চন্দ্র পালানোর চেষ্টা করলে তাকে গুলি করা হয়। এছাড়া আরেক পুরোহিতের উপর ককটেল হামলা চালায় তারা। এ সময় মঠের বাইরে কাজ করার সময় সাধুদের সাহায্য করতে এগিয়ে এলে নিতাই পদ দাশ নামে এক ব্যক্তির ওপরও ককটেল নিক্ষেপ করে দুর্বৃত্তরা। আহত নিতাই ও গোপালের মাকে দেবীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ভর্তি রয়েছে।
মঠের পুজারী রাধামাধব দাসসহ ওই এলাকার কয়েকজন ব্যক্তি ঘটনার সময় দুজন যুবককে মঠ থেকে বেরিয়ে যেতে দেখেন। তাদের দেখে দুর্বৃত্তরা ককটেল বিস্ফোরণ ঘটান।
অধ্যক্ষের ভাই রবীন্দ্র রায় ও স্থানীয় সাধুরা জানান, অধ্যক্ষ যগেশ^র দেবীগঞ্জ উপজেলার সোনাহার ইউনিয়নের সোনাহার গ্রামের জমিজমা বিক্রি করে চলে আসেন দেবীগঞ্জ করতোয়া ব্রিজের পশ্চিম পাড়ে সোনাপোতা এলাকায়। এখানে এসে তিনি ১৯৯৮ সালে মঠটি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি এ মঠের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ। তিনি ব্রম্মচারী (বিয়ে করেননি) ছিলেন। তিন ভাই ও দুই বোন তার। তারা সকলেই গ্রামের বাড়ি সোনাহারে থাকেন। এই মঠে ধর্মসভা, ধর্ম নিয়ে আলোচনা আর পূর্জা অর্চনা করা হয়। বিভিন্ন এলাকা থেকে সাধুরা এখানে এসে আলোচনায় যোগ দেন। দুয়েকদিন থেকে আবার চলে যান।
/এসএম/এনএস/