গত ১৭ ফেব্রুয়ারি রাতে লোহারপুল এলাকার স্বপন মিয়ার এসএম প্লাস্টিক ফ্যাক্টরিতে এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটে। কামরাঙ্গীরচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মহসিন আলম ও প্রত্যক্ষদর্শীরা এসব তথ্য জানান।
ওসি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘১৭ ফেব্রুয়ারি ভোর ৫টায় কামরাঙ্গীরচরের লোহারপুলের এসএম প্লাস্টিক ফ্যাক্টরির শ্রমিক সাকিবকে হত্যা করে তার চাচা ও সহযোগীরা। এরপর বস্তায় ভরে লোহারপুল ব্রিজের উপর দিয়ে ফেলে দিয়ে লাশ ঘুম করার চেষ্টা করে। এ ঘটনায় নিহত সাকিবের বাবা খোকন মিয়া গত ২৪ ফেব্রুয়ারি কামরাঙ্গীরচর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলা নম্বর ২৪। এরপর চাচা মান্নান (২৯) ও তার সহযোগী জুলহাসকে(২৩) গ্রেফতার করা হয়। তাদের মধ্যে জুলহাস দোষ স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবনবন্ধি দিয়েছে। চাচা মান্নান তিনদিনের রিমান্ডে রয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে সাকিবের লাশ এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি। ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল ও মাঝিদের দিয়ে লাশ প্রতিদিনই খোঁজা হচ্ছে।’
আসামির স্বীকারোক্তি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে ওসি বলেন, ‘সাকিব তার চাচা মান্নান, জুলহাস সবাই ওই প্লাস্টিক ফ্যাক্টরিতে কাজ করতো। ফাতেমা (১৬) নামে এক মেয়েও ওই ফ্যাক্টরিতে কাজ করতো। তার গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জ। মান্নানের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তাদের প্রেম ভেঙে যাওয়ার পর মান্নানের ভাতিজা সাকিবের সঙ্গে ওই মেয়ের প্রেমের সম্পর্ক হয়। এতে মান্নান ক্ষিপ্ত হয়। সে সাকিবকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সাকিব ও অপর শ্রমিক রিপন গাজী ফ্যাক্টরির পাটাতনে ঘুমাচ্ছিল। ভোর ৪টার দিকে মান্নান, জুলহাস ও সজল সেখানে গিয়ে একটি লোহার পাইপ দিয়ে সাকিবের মাথায় আঘাত করে। এরপর তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। এসময় রিপন গাজী ঘুম থেকে জেগে উঠে। তাকেও হত্যা করার জন্য উদ্যত হয় তিনজন। তার মাথায়ও আঘাত করা হয়। এতে তার মাথা ফেটে যায়। অপর একজন তাকে চাপাতি দিয়ে কোপ দেয়, হাত দিয়ে রিপন চাপাতির কোপ ঠেকালে তার একটি আঙ্গুল কেটে যায়। রিপন গাজী তাকে হত্যা না করার জন্য মাফ চায়, অনুনয় বিনয় করতে থাকে। এই ঘটনা কাউকে বলবে না বলে সে কসম করে বললে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর ওই ভোরেই রিপন গাজী নরসীংদীতে চলে যায়। এদিকে সাকিবের লাশ বস্তায় ভরে ফ্যাক্টরি থেকে অল্প দূরে লোহারপুল থেকে ফেলে দেয় মান্নান ও তার সহযোগীরা।’
নরসীংদীর পলাশ উপজেলার ফুলবাড়িয়াতে রিপন ও সাকিবের গ্রামের বাড়ি। রিপন আহত অবস্থায় বাড়িতে যাওয়ায় তার বাবা-মা তার কাছে এ বিষয়ে জানতে চায়। এরপর রিপন তার বাবাকে সব জানায়। রিপনের বাবা সাকিবের বাবা খোকন মিয়াকে ঘটনা খুলে বলেন। এরপর রিপনকে চিকিৎসার জন্য পলাশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। তখন বিষয়টি স্থানীয় (পলাশ থানা) পুলিশ জেনে যায়। পলাশ থানা পুলিশ কামরাঙ্গীরচর থানা পুলিশকে জানায়। এরপর সাকিবের বাবাকে কামরাঙ্গীরচর থানার ওসি শেখ মহসীন আলম ঢাকা আসতে বলেন। খোকিন মিয়া ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় আসেন। ২৪ ফেব্রুয়ারি তিনি একটি মামলা দায়ের করেন। এরপর রিপন গাজীর সঙ্গে কামরাঙ্গীরচর থানা পুলিশ কথা বলে। রিপন পুলিশকে হত্যাকারীদের নাম ঠিকানা জানায়। এরপর সাকিবের চাচা মান্নান ও তার সহযোগী জুলহাসকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের মধ্যে জুলহাস আদালতে স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্ধি দিয়েছেন।
মামলার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী রিপন গাজী পুলিশকে জানিয়েছে, সাকিবকে হত্যা করে বস্তায় ভরে একটি ভ্যানে করে কামরাঙ্গীরচরের লোহারপুলে নিয়ে খুব ভোরেই ফেলে দেওয়া হয়। এরপর তারা চুপচাপ থাকে।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার বিষয়ে ওই মেয়েটি ও ফ্যাক্টরির মালিক স্বপন মিয়া কিছুই জানে না। ঘটনার সময় মেয়েটি বাড়িতে ছিল। ফ্যাক্টরির শিফট অনুয়ায়ী কাজ হয়। শিফট পরিবর্তনের সময় ফ্যাক্টরিতে লোকজন কম থাকে। তাই তারা শেষ রাতে হত্যার জন্য এই সময়টা বেছে নিয়েছে।
নিহত সাকিবের বাবা খোকন মিয়া ঘটনার পর থেকে লোহারপুলে বুড়িগঙ্গা নদীতে ছেলের লাশ খুঁজে বেরাচ্ছেন। তবে তার লাশের সন্ধান পায়নি পুলিশ। ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল প্রতিদিন সেখানে তল্লাশি চালাচ্ছে। তবে তার লাশের সন্ধান মিলেনি।
মান্নান ও সাকিব একই গোষ্ঠীর। এই সম্পর্কে মান্নান সাকিবের চাচা হয়। তারা তিন বছর ধরে ওই ফ্যাক্টরিতে কাজ করতো।
দারিদ্র পিতা খোকন মিয়া নির্বাক হয়ে বুড়িগঙ্গা নদীর পাশেই দাড়িয়ে বসে থাকছেন দিনরাত। সোমবার বিকালে বাড়িতে যাওয়ার আগে কান্না জড়িত কণ্ঠে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ছেলের লাশটিও বাড়িতে নিয়ে যেতে পারলাম না। আমার ছেলের লাশ আমি কোথায় খুঁজব।’
এদিকে পুলিশ সাকিবের লাশ খোঁজার জন্য নৌ-পুলিশ, কেরানীগঞ্জ মডেল থানা ও ফায়ার সার্ভিসকে ঘটনাস্থলে লাগিয়ে রাখা হয়েছে। সাকিবের বাবাকে সান্ত্বনা দিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। অপর আসামি সজলকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে বলেও জানান ওসি।
/এআরআর/ এএইচ/