দুই সন্তান হত্যা

মাকে জিজ্ঞাসাবাদে বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নিচ্ছে পুলিশ




মাহফুজা মালেক জেসমিনরামপুরায় দুই শিশু হত্যার ঘটনায় মা মাহফুজা মালেক জেসমিনকে পুলিশের নিজস্ব বিশেষজ্ঞ ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে তিনি দুই সন্তানকে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। তবে এই হত্যা তিনি একাই করেছেন নাকি সঙ্গে আরও কেউ ছিল তা জানার চেষ্টা করছেন তদন্ত কর্মকর্তা। মহানগর পুলিশের বিভিন্ন সূত্র বাংলা ট্রিবিউনকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
সূত্র জানায়, মানসিক সমস্যার কথা ওঠার পর পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদে সতর্কতা অবলম্বন করছে। পুলিশের বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তারা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। এ সময় মনোরোগ বিশেষজ্ঞদেরও সহায়তা নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে মা জেসমিন দুই সন্তানকে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন, তবে কী কারণে এবং কীভাবে তাদের হত্যা করেছেন, তা বিস্তারিত জানাননি। এসব তথ্য জানার জন্য তাকে সতর্কতার সঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
সূত্রটি আরও জানায়, ঘটনার পর দুই সন্তানের বাবা-মায়ের কললিস্ট পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছে ডিবি ও র‌্যাব। তবে তাদের ফোনে বিবাহবর্হিভূত কোনও সম্পর্কের প্রমাণ মিলেনি। এসব বিষয়ে এখনই উপসংহারে আসতে চায় না পুলিশ। আরও যাচাই বাছাই করে তারপর এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বালিশের কাভার, বিছানার চাদর, ওড়নাসহ বেশকিছু আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। সেগুলোর ডিএনএ টেস্ট করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রামপুরা থানার পরিদর্শক মোস্তাফিজুর রহমান।
তিনি বলেন, ‘আমরা ছাড়াও সিআইডি আলামত নিয়েছে। তারা আলামত পরীক্ষা করে দেখছেন। কেউ কেউ ধারণা করছেন, তাদের গলাটিপে হত্যা করা হয়েছে, আবার কেউ ধারণা করছে ওড়না পেঁচিয়ে। আমরা আলামতের পরীক্ষার পর এসব বিষয়ে জানতে পারব।’

এদিকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের সহায়তার বিষয়টি রবিবার ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলামও সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘মাহফুজা মালেক জেসমিনকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। তিনি নিজের দুই সন্তানকে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। তবে এর সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রয়েছে। মা হিসাবে নয়, একজন রক্তমাংসের মানুষ হিসাবে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এমন কী ঘটনা ঘটলো যে সন্তানকে সরিয়ে ফেলতে হবে। এসব অনেকগুলো বিষয় মাথায় রেখেই আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করছি। জিজ্ঞাসাবাদ শেষেই আমরা বুঝতে পারব, আসলে কীভাবে ঘটনাটি ঘটেছিল।’

তিনি বলেন, ‘আমরা তার মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন আছি। আমরা সবকিছু মাথায় রেখে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছি। মাহফুজা নিজে উচ্চশিক্ষিত। কলেজেও চাকরি করেছেন। পরে ছেড়ে দিয়েছেন। কিন্তু তাদের সংসারে আর্থিক সমস্যা ছিল। এখান থেকে হতাশা কাজ করতে পারে।’

মা ছাড়াও অন্য কারো যোগসাজশ রয়েছে কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘তিনি ছাড়া অন্য কারো যোগসাজশ রয়েছে কিংবা বা অন্য কারো দায় আড়াল করতে নিজে দায় স্বীকার করছেন কিনা তা তদন্তের পর জানা যাবে।’

দুই সন্তান হত্যার মামলাটি জটিল। এ ধরণের ঘটনায় অনেক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত করতে হয়। পারিপার্শ্বিক সব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই তদন্ত চলছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

গত সোমবার বিকালে রামপুরার বনশ্রীর বি-ব্লকের ৪ নম্বর সড়কের ৯ নম্বর বাসার পঞ্চম তলায় নুসরাত ও আলভী নিহত হয়। মৃত্যুর পর নিহত দুই সন্তানের মা জেসমিন ও খালা মিলা সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, খাবারের বিষক্রিয়ায় তাদের মৃত্যু হয়েছে। তবে ময়নাতদন্তে চিকিৎসকরা জানান, তাদের হত্যা করা হয়েছে। এরপর শিশু দুটির পরিবারের সদস্য, শিক্ষক, বাসার নিরাপত্তারক্ষী ও চাইনিজ রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার, বাবুর্চিসহ কয়েকজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। বুধবার লাশ দাফনের পর গ্রামের বাড়ি থেকে দুই সন্তানের বাবা-মাকে ঢাকায় নিয়ে আসে র‌্যাব। ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে সন্তানদের হত্যার কথা স্বীকার করেন মা জেসমিন। এরপর সন্তানদের বাবা আমান উল্লাহ বাদী হয়ে রামপুরা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় সন্তানদের মাকেই একমাত্র আসামি করা হয়। ওই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রামপুরা থানার পরিদর্শক মোস্তাফিজুর রহমান শুক্রবার আসামি জেসমিনকে দশ দিনের রিমান্ডে চান। আদালত পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমরা সবকিছু মাথায় রেখেই তদন্ত করছি। সম্ভাব্য যেসব কারণে এই হত্যাকাণ্ড হতে পারে, তা মাথায় রেখে তদন্ত কাজ চলছে।’

/এআরআর/এজে/