রবিবার দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত ঢাকা মহানগর হাকিম গোলাম নবীর আদালতে মাহফুজা মালেক জেসমিন স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। রিমান্ড শেষ হওয়ার একদিন আগেই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা লোকমান হেকিম জেসমিনকে আদালতে হাজির করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়ার আবেদন করেন। কারণ জেসমিন স্বীকারোক্তি দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমরা ভদ্রমহিলাকে আদালতে হাজির করেছি। তিনি জবানবন্দি দিতে রাজি হয়েছেন। তবে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলেই সেটি তদন্তের শেষ নয়। এটি একটিমাত্র এভিডেন্স। অন্য যেসব বিকল্প (হত্যার অন্য কোনও কারণ), সেগুলোর কিছু না পেলেও আমরা তদন্ত অব্যাহত রাখব। আমরা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এই মামলার বিষয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নেব না। কারণ এটি একটি দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা।
জেসমিন মালেক শারীরিকভাবে সুস্থ। মানসিকভাবে সকল ঘটনা তিনি মনে করতে পারেন উল্লেখ করে মনিরুল ইসলাম বলেন, তিনি বলেছেন, সন্তানদের তার কাছে বোঝা মনে হয়েছে। হত্যার পরে তার মাথা থেকে একটি বোঝা নেমে গেছে। জেসমিন মানসিকভাবে সুস্থ কি অসুস্থ—এ বিষয়ে মন্তব্য করার বিষয়ে আইনগত অধিকার আমাদের নেই। তাকে আপদদৃষ্টিতে সুস্থ মনে হয়। তবে আদালতের অনুমতি নিয়ে সাইকোলজিস্ট ও সাইকিয়াট্রিস্টের সঙ্গে কথা বলে তার রোগ নির্ণয়ের চেষ্টা করব।
পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, বনশ্রীতে দুই শিশু হত্যার ঘটনায় হন্তারক হিসেবে দাবিকারী তাদের মা গ্রেফতার হয়ে রিমান্ডে রয়েছেন। এই মুহূর্তে তিনি দ্বিতীয় দফায় রিমান্ডে রয়েছেন। তিনি সন্তান হত্যার দায় স্বীকার করেছেন এবং কারণও ব্যাখ্যা করেছেন। তবে শুরু থেকেই এর কারণ নিয়ে আমাদের সন্দেহ ছিল। শুধু বাচ্চাদের লেখাপড়া নিয়ে তার মা সন্তানকে হত্যা করতে পারেন কি না? এই সন্দেহ থেকে আমরা দুই-তিনটি বিষয়ে নিয়ে কাজ করেছি। প্রথমেই আমরা কাজ করেছি ওই দুই সন্তান এমন কিছু দেখে ফেলেছে, যে কারণে তাদের সরিয়ে ফেলার জন্য এই হত্যাকাণ্ড করা হয়েছে কিনা? তাই আমরা তাদের বাল্যকাল, দৈনন্দিন ঘটনা খতিয়ে দেখেছি। তবে আমরা তাদের গোপন কোনও তথ্য এখন পর্যন্ত খুঁজে পাইনি। যে কারণে এই হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে। দ্বিতীয়ত অন্য কারও অপরাধের দায় নিজের কাঁধে নিয়ে মা জেসমিন ওই দুই শিশুকে হত্যা করেছেন কি না—তাও খতিয়ে দেখেছি। তাও কিছু পাইনি।
একজন মায়ের পক্ষে এ রকম দুটি সন্তানকে হত্যা করার সম্ভব কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে মনিরুল ইসলাম বলেন, আমরা একাধিক সাইক্লোজিস্ট ও সাইক্রেটিস্টের সঙ্গে কথা বলেছি। আমাদের প্রাপ্ত তথ্য নিয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছি। তারাও বলেছেন, এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। এ রকম ঘটনার বিরল হলেও অসম্ভব নয়। বিশ্বে এবং আমাদের দেশে এ রকম একাধিক ঘটনা রয়েছে। আমেরিকাতে এক মা তার পাঁচ সন্তানকে হত্যা করে তার স্বামী ও পুলিশকে ফোন দিয়েছিলেন। আমাদের রাজধানীর আদাবর ও জুরাইনেও এধরণের ঘটনা ঘটেছিল। তবে তার কারণ ভিন্ন ছিল। এই ঘটনা বিরল হলেও অসম্ভব না।’
গত ২৯ ফেব্রুয়ারি বিকালে রামপুরার বনশ্রীর বি-ব্লকের ৪ নম্বর সড়কের ৯ নম্বর বাসার পঞ্চম তলায় নুসরাত ও আলভী নিহত হয়। মৃত্যুর পর নিহত দুই সন্তানের মা জেসমিন ও খালা মিলা সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, খাবারের বিষক্রিয়ায় তাদের মৃত্যু হয়েছে। তবে ময়নাতদন্তে চিকিৎসকরা জানান, তাদের হত্যা করা হয়েছে। এরপর শিশুদুটির পরিবারের সদস্য, শিক্ষক, বাসার নিরাপত্তারক্ষী ও চাইনিজ রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার, বাবুর্চিসহ কয়েকজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। বুধবার লাশ দাফনের পর গ্রামের বাড়ি থেকে দুই সন্তানের বাবা-মা কে ঢাকায় নিয়ে আসে র্যাব। ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে সন্তানদের হত্যার কথা স্বীকার করেন মা জেসমিন। এরপর সন্তানদের বাবা আমান উল্লাহ বাদী হয়ে রামপুরা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় সন্তানদের মাকেই একমাত্র আসামি করা হয়। বর্তমানে মামলাটি ডিবি তদন্ত করছে।
/এমএনএইচ/