দিল্লির সীমান্ত সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধান উদ্বেগ সীমান্ত হত্যা ও পুশইন

সীমান্ত হত্যা, বিএসএফের পুশইন, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান, সীমান্তে অবকাঠামো নির্মাণ এবং পার্বত্য অঞ্চলের সশস্ত্র গোষ্ঠীর কার্যক্রম— এসব ইস্যুতে ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) কাছে উদ্বেগ জানিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। একইসঙ্গে সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনা এবং পুশইন কার্যক্রম বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ। গত ৮ থেকে ১১ জুন ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত বিজিবি-বিএসএফের ৫৭তম মহাপরিচালক পর্যায়ের সীমান্ত সম্মেলন শেষে উভয় পক্ষের এক যৌথ বিবৃতিতে এসব বিষয় আলোচিত হয়েছে বলে জানানো হয়। 

শুক্রবার (১২ জুন) গণমাধ্যমে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানান বিজিবির সদর দফতরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শীর্ষ পর্যায়ের এই সম্মেলনে বিজিবির ১৪ সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী। বিএসএফের ১২ সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন মহাপরিচালক প্রবীন কুমার। আগামী নভেম্বরে ঢাকায় পরবর্তী মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক আয়োজনের বিষয়ে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে দুই পক্ষ।

সীমান্ত হত্যা নিয়ে উদ্বেগ

সীমান্তে বিএসএফ সদস্য ও ভারতীয় নাগরিকদের হাতে নিরস্ত্র বাংলাদেশি নাগরিক নিহত ও আহত হওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বিজিবি। সম্মেলনে সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান বিজিবি মহাপরিচালক।

জবাবে উভয় পক্ষ সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, যৌথ টহল বৃদ্ধি, নজরদারি বাড়ানো এবং অবৈধ সীমান্ত অতিক্রম প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধির বিষয়ে একমত হয়। পাশাপাশি সীমান্তে সংঘটিত হত্যা ও হামলার ঘটনাগুলো তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

পুশইন ইস্যুতে বাংলাদেশের আপত্তি

সাম্প্রতিক সময়ে রোহিঙ্গাসহ বিভিন্ন ব্যক্তিকে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ জানায় বিজিবি। সীমান্ত সম্মেলনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, এ ধরনের কার্যক্রম বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক চুক্তি, সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (সিবিএমপি) এবং পূর্ববর্তী সমঝোতার পরিপন্থী। বিজিবি জানায়, যাচাই-বাছাই শেষে বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রচলিত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় গ্রহণ করা হবে। তবে পুশ-ইনের পরিবর্তে কূটনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণের ওপর জোর দেয় বাংলাদেশ।

অন্যদিকে বিএসএফ অনিষ্পন্ন জাতীয়তা যাচাই দ্রুত সম্পন্ন করার আহ্বান জানায়। এ বিষয়ে উভয় পক্ষ বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক ব্যবস্থার আওতায় কাজ চালিয়ে যেতে সম্মত হয়।

মাদক, অস্ত্র ও চোরাচালান

ভারত থেকে বাংলাদেশে ফেনসিডিল, হেরোইন, ইয়াবা, গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদক প্রবেশ এবং অস্ত্র ও গোলাবারুদ চোরাচালান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিজিবি। বাংলাদেশ এসব বিষয়ে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করে।

জবাবে বিএসএফও মাদক ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধের বিরুদ্ধে একই নীতির কথা উল্লেখ করে। উভয় পক্ষ সমন্বিত টহল, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং চোরাচালানবিরোধী কার্যক্রম জোরদারে একমত হয়।

রোহিঙ্গা ও অবৈধ অভিবাসন

ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের অবৈধ অনুপ্রবেশ নিয়ে উদ্বেগ জানানো হলে বিজিবি বলে, বাংলাদেশ কখনও তার ভূখণ্ড ব্যবহার করে রোহিঙ্গাদের ভারতে প্রবেশের সুযোগ দেয় না। বরং ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করা রোহিঙ্গাদেরও আটক করা হয়েছে।

দুই পক্ষ মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং ভুক্তভোগীদের উদ্ধার ও পুনর্বাসনে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়।

সীমান্তে বেড়া ও অবকাঠামো নির্মাণ

আন্তর্জাতিক সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে বিএসএফ ও ভারতীয় নাগরিকদের বিভিন্ন নিরাপত্তা অবকাঠামো নির্মাণের চেষ্টার বিষয়টি তুলে ধরে বিজিবি। বাংলাদেশ জানায়, এ ধরনের কাজের ক্ষেত্রে পূর্বানুমতি প্রয়োজন এবং বিষয়গুলো কূটনৈতিক চ্যানেলে নিষ্পত্তি হওয়া উচিত।

বিএসএফের পক্ষ থেকে বলা হয়, সীমান্তবর্তী জনগণের সুবিধা ও অপরাধ প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে কিছু অবকাঠামো স্থাপন করা হয়। তবে উভয় পক্ষই ১৫০ গজের মধ্যে অননুমোদিত নির্মাণ এড়িয়ে চলতে সম্মত হয়।

পার্বত্য অঞ্চলের সশস্ত্র গোষ্ঠী

মিজোরামে বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর সম্ভাব্য উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানায় বিজিবি। জবাবে বিএসএফ জানায়, ভারত তার ভূখণ্ড কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের সুযোগ দেয় না। উভয় পক্ষ সন্ত্রাসবাদ ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ এবং গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় জোরদারে সম্মত হয়।

পানি, সীমান্ত পিলার ও অন্যান্য

সম্মেলনে কুশিয়ারা নদীর পানি উত্তোলন, নদীতীর সংরক্ষণ, সীমান্ত পিলার নির্মাণ, জাল মুদ্রা ও স্বর্ণ চোরাচালান এবং সীমান্ত নির্ধারণের বকেয়া বিষয়গুলোও আলোচনা হয়। এসব ইস্যু সংশ্লিষ্ট যৌথ কমিশন ও দ্বিপাক্ষিক ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাধানের বিষয়ে একমত হয় দুই দেশ।

সম্মেলন শেষে উভয় দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মহাপরিচালকরা বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে যৌথভাবে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।