দুবাই পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছেন সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ। তাকে দ্রুত ফিরিয়ে আনার কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি একটা ধারণা দিয়েছেন জাতীয় সংসদে। তিনি জানান, গত ১২ জুন দুবাই পুলিশ তাকে গ্রেফতারের বিষয়ে ই-মেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে জানিয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এনসিবি আবুধাবি জানিয়েছে, ইউএই ফেডারেল ল নম্বর ৩৯ অব ২০২৬ অনুযায়ী গ্রেফতারের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক এক্সট্রাডিশন রিকোয়েস্ট পাঠাতে হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২০, ৪৬৭, ৪০৮, ৪৭১ এবং ১০৯ ধারাসহ ১৯৭৪ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন এবং বাংলাদেশ পাসপোর্ট অর্ডার, ১৯৭৩ এর ১১ ধারায় মামলা বিচারাধীন।
তিনি বলেন, এ বিষয়ে এনসিবি ঢাকা ইন্টারপোল চ্যানেলের মাধ্যমে রেড নোটিশ প্রকাশ, আন্তর্জাতিক সমন্বয়, বিদেশি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ এবং গ্রেফতার-পরবর্তী ফলোআপ কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে। দুদক প্রত্যর্পণের জন্য প্রয়োজনীয় মামলা, গ্রেফতারি পরোয়ানা ও তদন্ত-সংক্রান্ত দলিলাদি প্রস্তুত করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক্সট্রাডিশন প্রস্তাব প্রস্তুত ও অনুমোদনের পর কূটনৈতিক চ্যানেলে ইউএই কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিক এক্সট্রাডিশন রিকোয়েস্ট পাঠাবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আবুধাবির সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুতই তাকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হবে। এটি বাংলাদেশ পুলিশের একটি ঐতিহাসিক সাফল্য। এর মাধ্যমে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসা সম্ভব হবে। পাশাপাশি জাতিকে আশ্বস্ত করা যাবে যে, অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়।
পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এর আগেও ইন্টারপোলের সহায়তায় আসামি দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। ঢাকায় বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতা জাহিদুল ইসলাম হত্যা মামলার আসামি সুমন সিকদার ওরফে মুসাকে ওমান থেকে ২০২২ সালের মে মাসে কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। কিন্তু দেশটির সঙ্গে বন্দিবিনিময় চুক্তি নেই। ওমান পুলিশ আসামিকে ধরে প্লেনে করে দিয়েছিল। এর আগে ২০১৫ সালে শিশু শেখ সামিউল আলম রাজন হত্যা মামলার প্রধান আসামি কামরুল ইসলামকে সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। দুই দেশের মধ্যে বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকায় ইন্টারপোলের সহায়তায় কামরুলকে সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়।
পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, ইন্টারপোল রেড নোটিস জারি করলেও অনেক সময় আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় না। ২০১৯ সালের অক্টোবরে দুবাইয়ে গ্রেফতার হন বাংলাদেশ পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান আহমেদ। সে সময় তাকে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়। কিন্তু গ্রেফতারের কয়েক দিন পরই সেখানে জামিন হয় তার। পরে তিনি দুবাই থেকে অন্য দেশে চলে যান।
এ বছরের ৭ মে ইন্টারপোলের সহায়তায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই থেকে হত্যা মামলার আসামি আরিফ সরকারকে দেশে ফিরিয়ে এনেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পিবিআই জানিয়েছে, আরিফ সরকার নরসিংদীর শিবপুর উপজেলা চেয়ারম্যান ও বীর মুক্তিযোদ্ধা হারুন অর রশিদ খান হত্যা মামলার আসামি। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে একই মামলার আরেক আসামি মহসিন মিয়াকে ইন্টারপোলের সহায়তায় দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।
পিবিআই বলছে, মহসিন মিয়া আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে আরিফ সরকারসহ অন্য আসামিদের বিষয়ে তথ্য দেন। এরপর তদন্তে আরিফ সরকারের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার পর তার অবস্থান শনাক্ত করতে ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোর (এনসিবি) মাধ্যমে উদ্যোগ নেওয়া হয়। ইন্টারপোলের সহায়তায় দুবাই পুলিশ আরিফ সরকারকে গ্রেফতার করে বাংলাদেশ পুলিশকে বিষয়টি জানায়। পরে পিবিআই ও পুলিশ সদর দফতরের সমন্বয়ে গঠিত একটি দল দুবাই গিয়ে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনে।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে দন্ডিত আসামি ফিরিয়ে আনার বিষয়ে চুক্তি আছে বাংলাদেশের। এই চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের অপরাধী কাউকে দুবাই পুলিশ গ্রেফতার করলে পারস্পারিক সমঝোতার ভিত্তিতে ফিরিয়ে আনা যায়।
বাংলাদেশের বন্দি প্রত্যর্পণ আইনে কীভাবে বাংলাদেশের সরকার আবেদন করে আসামি বিদেশ থেকে ফিরিয়ে আনতে পারবে সে বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে।
আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশে চুক্তিভুক্ত রাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রতিনিধি অথবা ওই রাষ্ট্রে নিয়োজিত বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধির মাধ্যমে অপরাধীদের ফেরাতে বাংলাদেশ আবেদন করতে পারে। এছাড়াও সরকার এবং চুক্তিভুক্ত রাষ্ট্রের সরকারের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে নির্ধারিত অন্য কোনও পদ্ধতিতে দ্বিপাক্ষিক সম্মতিতে নির্দিষ্ট যে কোনও ব্যবস্থায় অপরাধীদের ফেরাতে পারে বাংলাদেশ।
ভারত ও থাইল্যান্ডের সঙ্গে শুধু বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি আছে, আমিরাতের সঙ্গে আছে দণ্ডিত বন্দি বিনিময় চুক্তি।
পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, সব প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশ থেকে একটি প্রতিনিধিদল দুবাই যাবে। গিয়ে আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনবে।