এআই ক্যামেরায় ২০ হাজার ফুটেজ: সবচেয়ে বেশি ধরা খেলেন কারা?

রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে গত প্রায় দুই মাস ধরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) ক্যামেরা ব্যবহার করছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। গত ৭ মে চালু হওয়া এই প্রযুক্তির মাধ্যমে এখন পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার মামলা করা হয়েছে। পাশাপাশি আইন লঙ্ঘনের অন্তত ২০ হাজার ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে, যা যাচাই-বাছাই শেষে পর্যায়ক্রমে মামলা দেওয়া হবে।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে ১০৫টি এআই ক্যামেরা বসানো হয়েছে। প্রায় সব সিগন্যালেই এখন অধিকাংশ চালক আইন মেনে চলছেন।

তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে প্রায় ২০ হাজার ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব ফুটেজ ডিএমপির ট্রাফিক টেকনিক্যাল ইউনিট (টিটিইউ) যাচাই-বাছাই করছে। ইতোমধ্যে দেড় হাজার মামলা দেওয়া হয়েছে। যাচাই শেষে আরও মামলা দেওয়া হবে।’

ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত সংগৃহীত ফুটেজে সবচেয়ে বেশি ধরা পড়েছে লাল বাতির সিগন্যাল অমান্য এবং বাম লেনে প্রতিবন্ধকতা তৈরির ঘটনা।

ট্রাফিক কর্মকর্তারা বলছেন, যান চলাচলের দিক থেকে দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খল এই মহানগরে চালকদের নিয়মের মধ্যে আনতে অতীতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসেনি। তাই উন্নত প্রযুক্তির এআই ক্যামেরা ব্যবহার শুরু করা হয়েছে। এতে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরতে শুরু করেছে এবং ট্রাফিক পুলিশের কাজও সহজ হয়েছে। ক্যামেরায় আইন লঙ্ঘনের ফুটেজ রেকর্ড হওয়ায় চালকদের মধ্যে আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতা ও নিয়ম ভাঙার প্রবণতা কমেছে।

মাঠপর্যায়ের ট্রাফিক কর্মকর্তারা জানান, এআই ক্যামেরায় ধারণ করা ফুটেজ ডিএমপির সদর দফতর থেকে মনিটর ও নিয়ন্ত্রণ করা হয়। পরে যাচাই-বাছাই শেষে ডিজিটাল মামলা দেওয়া হয়। এতে চালকদের মধ্যে আইন মানার প্রবণতা বেড়েছে। পাশাপাশি কেউ আইন ভাঙলে মামলা এড়ানোর সুযোগও থাকছে না।

ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ জানায়, গত ৭ মে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়। বর্তমানে আব্দুর গণি রোড মোড়, মৎস্য ভবন মোড়, কাকরাইল মসজিদ মোড়, বেইলি রোডের রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন সুগন্ধা মোড়, পুলিশ ভবন মোড়, রমনা পুরাতন থানা মোড়, ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়, বাংলা মোটর মোড়, সোনারগাঁও ক্রসিং, বিজয় স্মরণী মোড়, জাহাঙ্গীর গেট মোড়, মহাখালী বাস টার্মিনাল, শাহবাগ মোড়, সায়েন্স ল্যাব মোড়, ফার্মগেট মোড় এবং মোহাম্মদপুরের লেক রোডসহ মোট ১৮টি মোড় বা ক্রসিংয়ে এসব ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।

এসব ক্যামেরা লাল বাতি অমান্য, স্টপ লাইন ভঙ্গ, উল্টো পথে চলাচল, জেব্রা ক্রসিং দখল, হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো, সিটবেল্ট না পরা, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার, অবৈধ পার্কিং এবং অনুমতি ছাড়া ভিআইপি লাইট ব্যবহারের মতো বিভিন্ন অপরাধ শনাক্ত করছে।

এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে প্যান-টিল্ট-জুম (পিটিজেড) প্রযুক্তির ক্যামেরাও বসানো হয়েছে। এই ক্যামেরা দূর থেকে ডানে-বামে ও ওপরে-নিচে ঘোরানো এবং জুম করা যায়। বড় এলাকা পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি চলন্ত যানবাহন বা ব্যক্তিকে অনুসরণ করতে পারে। অপটিক্যাল জুমের মাধ্যমে দূর থেকেও গাড়ির নম্বরপ্লেট স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা সম্ভব।

এআই ক্যামেরা বসানোর ফলে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা জানান, সিগন্যাল পরিবর্তনের সময় আগের তুলনায় চালকেরা অনেক বেশি সতর্ক থাকছেন। বিশেষ করে মোটরসাইকেলচালকদের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে। আগে ট্রাফিক পুলিশ না দেখলে অনেকেই সিগন্যাল অমান্য করতেন, এখন ক্যামেরার উপস্থিতি তাদের আচরণে পরিবর্তন আনছে।

গত মঙ্গলবার (৩০ জুন) মোহাম্মদপুরের লেক রোডে এআই ক্যামেরার মাধ্যমে ট্রাফিক মামলা দায়ের ও যানবাহন মনিটরিং কার্যক্রমের উদ্বোধন শেষে ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘কদিন আগেও সিগন্যালে গাড়ি থামাতে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যদের রীতিমতো ছোটাছুটি করতে হতো। এখন সেটি লাগছে না। ট্রাফিক আইন মানাতে এআই ক্যামেরা বসানোর পর থেকেই বেশ পরিবর্তন হয়েছে।’

তিনি জানান, রাজধানীর ১৮টি মোড় বা ক্রসিংয়ে এসব ক্যামেরা বসানো হয়েছে। চালুর পর এখন পর্যন্ত দেড় হাজার মামলা এবং ৩৮ হাজার সমন জারি করা হয়েছে।

এদিকে বিভিন্ন সময় কিছু মোড়ে সিগন্যাল লাইট বন্ধ রেখে ট্রাফিক পুলিশকে ম্যানুয়ালি যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে দেখা যায়। এ বিষয়ে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, যখন সড়কে যানবাহনের চাপ বেড়ে যায় এবং যানজট সৃষ্টি হয়, তখন সাময়িকভাবে সিগন্যাল লাইট বন্ধ রেখে ম্যানুয়ালি ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও মামলা দেওয়া হয়। যানবাহনের চাপ কমে গেলে আবার সিগন্যাল লাইট চালু করা হয়।