আদালতের আদেশে ঢাকার গুলশানে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের দুটি ফ্ল্যাটে থাকা মালামালের তালিকা (ইনভেন্টরি) তৈরির কাজ শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংস্থাটি জানিয়েছে, ফ্ল্যাটে তিন শতাধিক কোট, ৫৩২টি টাই, শতাধিক কামিজ, রোলেক্স ব্র্যান্ডের ঘড়ির আটটি বক্স, সোফা, বেড এবং আরও অনেক মালামাল পাওয়া যায়। এগুলোর হিসাব মেলাতে লাগবে তিন দিন।
রবিবার (১৯ জুলাই) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে দুদকের কর্মকর্তারা ফ্ল্যাট দুটিতে প্রবেশ করেন। এ সময় পুলিশ সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।
দুদকের উপপরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা আকতারুল ইসলাম বলেন, আদালতের অনুমতি নিয়ে দুদকের উপপরিচালক মশিউর রহমানের নেতৃত্বে একটি যৌথ দল নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে সাবেক ভূমিমন্ত্রীর দুটি ফ্ল্যাটে মালামালের তালিকা তৈরির কাজ করছে।
অনুসন্ধান দলের নেতা মশিউর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ফ্ল্যাটে থাকা জিনিসপত্রের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। এটি শেষ করতে দুই দিন লাগবে।
দুদক কর্মকর্তারা জানান, তালিকা তৈরির সময় একটি ফ্ল্যাট থেকে রোলেক্স ব্র্যান্ডের একটি হাতঘড়ির ওয়ারেন্টি কার্ড পাওয়া গেছে। কার্ডে উল্লেখিত তথ্য অনুযায়ী, ঘড়িটির মডেল নম্বর ৫০৫১৯ এবং সিরিয়াল নম্বর ৭৩৪৫২৪৫৯। ক্রেতা হিসেবে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর নাম রয়েছে।
তাদের ভাষ্য, ঘড়িটি ২০১৯ সালের ২৪ জানুয়ারি লন্ডনের হ্যারডস ডিপার্টমেন্ট স্টোর থেকে কেনা হয়। ১৮ ক্যারেট হোয়াইট গোল্ডের রোলেক্স সেলিনি ডেট মডেলের এ ধরনের ঘড়ির দাম প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
ফ্ল্যাট দুটি গুলশানের ৬৬ নম্বর সড়কের নর্থওয়েস্ট (বি) ব্লকের ১১ নম্বর প্লটে অবস্থিত। এর মধ্যে এ-৭ নম্বর ফ্ল্যাটের আয়তন ৩ হাজার ৭৪৭ বর্গফুট এবং বি-৭ নম্বর ফ্ল্যাটের আয়তন ৩ হাজার ৮৩২ বর্গফুট। দুটি ফ্ল্যাটের মোট আয়তন ৭ হাজার ৫৭৯ বর্গফুট।
ঢাকা মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালতের আদেশে দুদকের সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিটের পরিচালককে ফ্ল্যাট দুটির রিসিভার নিয়োগ করা হয়। তার দায়িত্ব সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ, ব্যবস্থাপনা, তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা।
তবে ফ্ল্যাট দুটি তালাবদ্ধ থাকায় রিসিভার সেখানে প্রবেশ করতে পারছিলেন না। ফলে ফ্ল্যাট ভাড়া দেওয়ার উপযোগী করার কাজও সম্ভব হচ্ছিল না। পরে দুদকের আবেদনের পর গত ২৯ এপ্রিল আদালত অভিযোগসংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অনুপস্থিতিতেও ফ্ল্যাটে প্রবেশ এবং ভেতরে থাকা মালামালের তালিকা তৈরির অনুমতি দেন।
আদালতের আদেশ বাস্তবায়নে গুলশান রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. নিলয় রহমানকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। দুদকের চিঠিতে সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ এবং ভবনটির ব্যবস্থাপক ইমরান হোসেনকেও নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছিল।
আদালতের নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৮ নভেম্বর ফ্ল্যাট দুটি ক্রোকের আদেশ দেওয়া হয়। পরে চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি রিসিভার নিয়োগ এবং ২৯ এপ্রিল তালা খুলে ফ্ল্যাটে প্রবেশ ও মালামালের তালিকা করার অনুমতি দেন আদালত।
সাইফুজ্জামান চৌধুরী, তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং অর্থপাচারের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদকের একটি যৌথ দল।
চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, ভারত, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে তার ৩৩০টি বাড়ি, ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট জব্দের আদেশ দেন আদালত। দুদকের হিসাবে, এসব সম্পদ এবং যুক্তরাষ্ট্রের দুটি কোম্পানিতে তার বিনিয়োগের মূল্য প্রায় ২ হাজার ৩২১ কোটি টাকা।
এরপর ২৬ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাজ্যে তার নামে থাকা ৫১৮টি ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট জব্দের আদেশ দেওয়া হয়। দুদকের আবেদনে এসব সম্পদের মূল্য ২৭ কোটি ১৮ লাখ ৫২ হাজার ৮৭২ পাউন্ড উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের মার্চে তার ৩৯টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ এবং ২৩টি কোম্পানির শেয়ার জব্দের আদেশ দেন আদালত। একই অনুসন্ধানের বিভিন্ন পর্যায়ে তার ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আরও ব্যাংক ও বিও হিসাব অবরুদ্ধ করা হয়েছে।
অপরদিকে, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক থেকে ঋণের নামে ২৫ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগে করা মামলায় চলতি বছরের মার্চে সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, তার স্ত্রীসহ ৩৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন চট্টগ্রামের একটি আদালত। একই সঙ্গে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
দুদকের বিভিন্ন আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, সাইফুজ্জামান অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদ অর্জনের পাশাপাশি অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন। তবে অভিযোগগুলোর বিচারিক নিষ্পত্তি এখনও হয়নি।
বিদেশে থাকা সম্পদ নিয়ে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে সাইফুজ্জামান এর আগে দাবি করেছিলেন, বৈধ ব্যবসার আয় দিয়েই তিনি এসব সম্পদ কিনেছেন এবং তার বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।