দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী বাল্যবিবাহ একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবু দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গোপনে বা সামাজিক চাপে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে-মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার ঘটনা এখনও ঘটে চলেছে। সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রশাসনিক নজরদারি এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ সত্ত্বেও বাল্যবিবাহ পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হয়নি।
বাল্যবিবাহের সংজ্ঞা হিসেবে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সী কোনও মেয়ের অথবা ২১ বছরের কম বয়সী কোনও ছেলের বিয়ে হলে তা বাল্যবিবাহ হিসেবে গণ্য হবে।
রয়েছে শাস্তির বিধান
আইন অনুযায়ী, বাল্যবিবাহ সংঘটন, সম্পাদন, নিবন্ধন, উৎসাহ প্রদান বা সহায়তা করা—সবই দণ্ডনীয় অপরাধ। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, অথবা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে।
পরিবারের সদস্যরাও পাচ্ছেন না দায়মুক্তি
শুধু বর-কনেই নয়, পিতা-মাতা, অভিভাবক, কাজী, বিবাহ নিবন্ধক কিংবা বাল্যবিবাহে সহযোগিতা করা যেকোনও ব্যক্তিও আইনের আওতায় শাস্তির সম্মুখীন হতে পারেন।
যেসব কারণে এখনও বাল্যবিবাহ থামছে না
বেশ কিছু কারণে আইন করেও বাল্যবিবাহ থামানো যাচ্ছে না। এর মধ্যে, দারিদ্র্য, সামাজিক কুসংস্কার, মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, শিক্ষার অভাব, যৌতুকের আশঙ্কা এবং আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা বাল্যবিবাহের অন্যতম কারণ। অনেক ক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধন জালিয়াতি বা বয়স গোপন করেও বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটানো হয়।
বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর প্রভাব
বাল্যবিবাহ শুধু একটি আইনগত অপরাধ নয়—এটি শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং স্বাভাবিক বিকাশের পথে বড় বাধা। অল্প বয়সে মাতৃত্বের ফলে মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যায়, শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয় এবং পারিবারিক ও সামাজিক নির্যাতনের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। ফলে দারিদ্র্য ও বৈষম্যের চক্র আরও গভীর হয়।
সচেতনতা ও আইন প্রয়োগের ওপর জোরারোপের পরামর্শ
মানবাধিকার সংগঠন রাইজ ফর রাইটস ফাউন্ডেশনের (আরআরএফ) সাধারণ সম্পাদক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রাফিকুস ছালেকীনের মতে, শুধু আইন প্রণয়ন করলেই বাল্যবিবাহ বন্ধ করা সম্ভব নয়। এর জন্য শিক্ষা বিস্তার, জন্মনিবন্ধনের সঠিক ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘‘বাল্যবিবাহ একটি সামাজিক ব্যাধি, যা শিশুদের মৌলিক অধিকার, শিক্ষা এবং সুস্থ ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ফেলে। তাই আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবার, সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতা, জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই এই অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব। একটি শিশুর শৈশব, শিক্ষা ও স্বপ্ন রক্ষায় বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।’’