অনলাইন জুয়ায় বড় ফাঁদ, জীবনেও জেতার চান্স নেই

রাজধানী থেকে জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন হয়ে গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে অনলাইন জুয়ার বিস্তার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে প্রতিনিয়ত গ্রেফতার হচ্ছে এজেন্টরা, জব্দ হচ্ছে হাজার হাজার মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) নম্বর। তবে সাইবার বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু এজেন্ট গ্রেফতার করে এই অপরাধ বন্ধ করা সম্ভব নয়। তাদের ভাষ্য, অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইট ও অ্যাপই পুরো নেটওয়ার্কের মূলশক্তি। এগুলো বন্ধ না করলে এক এজেন্টের জায়গায় আরেক এজেন্ট তৈরি হবে, আর জুয়ার ফাঁদে পড়ে মানুষ নিঃস্ব হতে থাকবে।

অনলাইন জুয়া যে শুধু রাজধানী কিংবা দেশের বড় শহরকেন্দ্রিক নয়, তা সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানেই স্পষ্ট। বর্তমানে এটি জেলা থেকে উপজেলা, উপজেলা থেকে ইউনিয়ন এবং ইউনিয়ন থেকে একেবারে গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি এখন মহামারির পর্যায়ে পৌঁছেছে। অনলাইন জুয়ার ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হওয়ার পাশাপাশি হত্যাসহ নানা ধরনের অপরাধও ঘটছে। এ পরিস্থিতিতে সরকার সম্প্রতি কঠোর আইন প্রণয়ন করেছে। পুলিশও শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত নজরদারি বাড়িয়ে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনছে।

রাজধানী থেকে গ্রাম, চলছে অভিযান

১৫ জুলাই ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে অনলাইন জুয়া পরিচালনাকারী ছয় এজেন্টকে গ্রেফতার করে। একই সঙ্গে সাড়ে ৬ হাজারের বেশি মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) এজেন্ট নম্বর জব্দ করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে এত বিপুল সংখ্যক এজেন্ট নম্বর জব্দের ঘটনা এটিই প্রথম।

রাজধানীর বাইরে একই ধরনের অভিযান চালানো হচ্ছে। বুধবার (২২ জুলাই) রাতে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার কাথুলী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের নওপাড়া গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে আরিফুল ইসলাম (৩৫) নামে এক অনলাইন জুয়ার এজেন্টকে গ্রেফতার করে র‌্যাব-১২।

র‌্যাব জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তারা জানতে পারে আরিফুল দীর্ঘদিন ধরে ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে অনলাইন জুয়া পরিচালনা করছিলেন। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন প্রলোভন ও রেফারেল লিংক দিয়ে সাধারণ মানুষকে জুয়ায় উদ্বুদ্ধ করছিলেন। পরে বুধবার রাত ১১টা ৫০ মিনিটের দিকে তার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় একটি ল্যাপটপ, দুটি স্মার্টফোন, চারটি সিম কার্ড এবং এক হাজার ৯৭০ টাকা জব্দ করা হয়।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আরিফুল ইসলাম স্বীকার করেন, তিনি ১এক্সবেট, ১এক্সপার্টনার্স এবং মেলবেটসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে জুয়া পরিচালনা করতেন।

র‌্যাব-১২ মেহেরপুর ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুদীপ্ত সরকার জানান, গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির বিরুদ্ধে জুয়া প্রতিরোধ আইন-২০২৬-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় গাংনী থানায় মামলা করা হয়েছে।

যেভাবে কাজ করে অনলাইন জুয়ার নেটওয়ার্ক

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতিটি অনলাইন জুয়ার সাইটে প্রবেশ করলে নিবন্ধনের জন্য নাম, মোবাইল নম্বর ও পাসওয়ার্ড দিতে হয়। এই নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দেন এজেন্টরা। একজন এজেন্ট আবার শত শত নতুন এজেন্ট তৈরি করতে পারেন। এই এজেন্টরাই নতুন খেলোয়াড়দের নিবন্ধন করে দেন এবং শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত অনলাইন জুয়ার বিস্তারে ভূমিকা রাখছেন।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, প্রতিটি জুয়ার সাইটে শত শত নয়, লাখ লাখ এজেন্ট রয়েছে। মূলত তারাই যুবকদের অনলাইন জুয়ার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে।

বোনাসের লোভে শুরু, শেষে সর্বনাশ

প্রতিটি জুয়ার সাইট নতুন খেলোয়াড়দের জন্য বোনাসের ফাঁদ পাতে। নিবন্ধনের পর জমাকৃত অর্থের ওপর কখনও ৫০ শতাংশ, আবার কখনও ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বোনাস দেওয়া হয়।

দেখা যায়, কেউ এক হাজার টাকা জমা দিলে সাইট থেকে আরও এক হাজার টাকা যোগ করে তার ব্যালান্স দুই হাজার টাকা দেখানো হয়। এটি নিয়ে খেলা শুরু করলে প্রথম অবস্থায় অনেকে কিছুটা জিততেও পারেন। এরপরই শুরু হয় লোভ। সেই লোভে পড়ে একের পর এক টাকা জমা দিতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত সব হারিয়ে ফেলেন।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, টাকা জমা দেওয়ার পর বড় অঙ্কের অর্থ জিতলেও তা সঙ্গে সঙ্গে উত্তোলন করা যায় না। নির্দিষ্ট পরিমাণ খেলা শেষ করার পরই টাকা তোলার সুযোগ থাকে। কিন্তু সেই সময় আসার আগেই অধিকাংশ খেলোয়াড়ের ব্যালান্স শেষ হয়ে যায়। ফলে জয়ের চেয়ে হারের সংখ্যাই বেশি। আবার একদিন জেতার পর সেই জয়ের নেশায় পুনরায় খেলতে গিয়ে আরও বেশি অর্থ হারান তারা।

‘জীবনেও জেতার চান্স নেই’

সাইবার বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইন জুয়ার অ্যাপগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে শুরুতে খেলোয়াড়কে জিতিয়ে আত্মবিশ্বাস তৈরি করে। একে বলা হয় ‘লোয়ার দ্য গার্ড’ কৌশল। একবার আসক্তি তৈরি হলে অ্যালগরিদম এমনভাবে পরিচালিত হয় যে দীর্ঘমেয়াদে জেতা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইটি বিশেষজ্ঞ রাসেল সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্ম হচ্ছে মেগা ক্যাসিনো ওয়ার্ল্ড। এই ওয়েবসাইটে শত শত জুয়ার গেম রয়েছে। এসব গেমের আলাদা অ্যাপও আছে। অর্থাৎ একটি প্ল্যাটফর্মেরই বহু শাখা-উপশাখা রয়েছে।

এ ছাড়া ওয়ানএক্সবেট, মেলবেট ও ওয়ানএক্সপার্টনার্সও দেশের অন্যতম বড় অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্ম।

তিনি বলেন, ‘প্রথমত এসব ওয়েবসাইট ও অ্যাপের লিংক বন্ধ করতে হবে। তা সম্ভব না হলে বিকাশ, নগদ, রকেটসহ যেসব মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে এসব সাইটে টাকা জমা হয়, সেই এজেন্ট নম্বরগুলো বন্ধ করতে হবে। তবে সবচেয়ে কার্যকর হবে ওয়েবসাইটগুলো বন্ধ করে দেওয়া। এজেন্টদের খুঁজে বের করার চেয়ে সাইট বন্ধ করলে দেশে অনলাইন জুয়া দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসবে।’

অনলাইন জুয়ায় নিঃস্ব হওয়ার গল্প

কাওরান বাজার থেকে ভোরে পণ্য এনে মোহাম্মদপুরের কাঁচাবাজারে বিক্রি করতেন তরুণ ব্যবসায়ী আলিফ। কয়েক মাস আগে বাজারের এক পরিচিত ব্যক্তি তাকে মোবাইলের একটি অ্যাপ দেখিয়ে বলেন, ‘ক্রিকেট ম্যাচে ১০০ টাকা লাগাও, জিতলে ২৫০ পাবা।’ প্রথমে ১০০ টাকা বাজি ধরে ২২০ টাকা পান তিনি। এতে তার মনে হয়, সারা দিন রোদে পুড়ে যা আয় হয়, এখানে তা মিনিটেই সম্ভব। পরে কৌতূহল আর লোভ থেকেই অনলাইন জুয়ার নেশা তৈরি হয়। কয়েক মাসের মধ্যেই ব্যবসাসহ সব হারিয়েছেন আলিফ।

একই অভিজ্ঞতার কথা জানান বনশ্রীর বাসিন্দা জালাল। তিনি বলেন, শুরুতে বাজি ধরে জিতলেও পরে ক্যাসিনোতে গিয়ে সব হারিয়েছেন। আগে মুদি দোকান চালাতেন, এখন অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। স্ত্রী-সন্তানকে গ্রামে পাঠিয়ে দিয়েছেন। লজ্জায় নিজেও গ্রামে যেতে পারেন না। তার মতো রাজধানী নয়, প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও লাখো সচ্ছল মানুষ এই জুয়ার ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হয়েছেন।

অবৈধ লেনদেন ঠেকাতে নজরদারি

বিকাশের করপোরেট কমিউনিকেশনস প্রধান শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম জানান, অবৈধ আর্থিক লেনদেন শনাক্ত ও প্রতিরোধে তারা শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থা অনুসরণ করেন। কোনও সন্দেহজনক লেনদেন বা অ্যাকাউন্টের অস্বাভাবিক কার্যক্রম নজরে এলে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে নিয়মিত অবহিত করা হয়।

তিনি বলেন, ‘অনলাইন জুয়া, হুন্ডি, মানি লন্ডারিং, সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন এবং অননুমোদিত অর্থ স্থানান্তর বন্ধে বিকাশ উন্নত প্রযুক্তি এবং দক্ষ জনবল ব্যবহার করে কাজ করে যাচ্ছে।’

যা বলছে পুলিশ

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নিয়াজ মেহেদী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে অভিযান চলমান রয়েছে। আমরা এজেন্টদের গ্রেফতারের পাশাপাশি অনলাইন সাইটও বন্ধের ওপর জোর দিচ্ছি। এ বিষয়ে আমাদের সংশ্লিষ্ট দফতরের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক হয়েছে। আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি।’

সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু তালেব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সিআইডির দল দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করছে। জুয়ার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতারও করা হচ্ছে। আমরা বিষয়টি নিয়ে সর্বোচ্চ সজাগ। কারা, কীভাবে এটি পরিচালনা করছে, তা খুঁজে বের করছি।’