শাহজালালে ৫২ কেজি স্বর্ণ উদ্ধারে পৃথক ৩ মামলার কিনারা পাচ্ছে না পুলিশ

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৃথক তিনটি অভিযানে উদ্ধার হয়েছে ৫২ কেজি স্বর্ণ। এসব ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার তদন্তে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি করতে পারেনি বিমানবন্দর থানা পুলিশ। তদন্তের দায়িত্বে থাকা সংস্থা পুলিশ আলোচিত তিনটি ঘটনার কার্যত কোনো কূলকিনারাই করতে পারেনি।

সবশেষ ফলের ক্যারেটের ভেতর থেকে উদ্ধার হওয়া ১৬ কেজি স্বর্ণের ঘটনায় দায়ের করা মামলার এজাহারে আসামিদের নাম-ঠিকানা উল্লেখ থাকলেও তাদের গ্রেফতার তো দূরের কথা, তদন্তেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।

বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল ইসলাম তালুকদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, তারা তদন্ত করছেন। কী ধরনের তদন্ত হচ্ছে এবং এজাহারে আসামিদের নাম-ঠিকানা থাকার পরও কেন তাদের গ্রেফতার করা যাচ্ছে না— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আসামিদের ঠিকানায় গিয়ে পাওয়া যায়নি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রথম দুটি অভিযানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের স্পর্শকাতর স্থান থেকে ৩৬ কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়। এসব ঘটনায় মামলা দায়ের হলেও এজাহারে কারও নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে মামলা হওয়ার পর তদন্ত ও আসামি গ্রেফতারের দায়িত্ব তদন্তকারী সংস্থার। তারা যদি কোনো অগ্রগতি করতে না পারে, তবে সেটি তাদের ব্যর্থতা।

তাদের ভাষ্য, এত বড় ঘটনার তদন্ত ও আসামি গ্রেফতারে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তদন্তে অগ্রগতি না হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্য ইউনিটকে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু ঘটনাগুলো ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

পৃথক তিন অভিযানে উদ্ধার ৫২ কেজি স্বর্ণ

গত ২৮ মার্চ দিবাগত রাতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে প্রায় ১৮ কেজি সোনা জব্দ করা হয়। চালানটি দুবাই থেকে আসা বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট বিজি-৩৪৮-এর কার্গো কম্পার্টমেন্টের টয়লেটের প্যানেলের ভেতর সাদা কাপড়ে মোড়ানো অবস্থায় পাওয়া যায়। সেখানে ১৫৩টি স্বর্ণের বার ছিল। যার মোট ওজন ১৭ কেজি ৯০১ গ্রাম। ২৪ ক্যারেটের এই স্বর্ণের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৪৬ কোটি টাকা।

এ ঘটনায় সংস্থাটির সাত কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কয়েকজনের মোবাইল ফোনে স্বর্ণ চোরাকারবারিদের ব্যবহৃত সাংকেতিক চিহ্ন বা কোড পাওয়া যায়। পরবর্তীতে ঘটনাটি অধিকতর তদন্তের সিদ্ধান্ত হওয়ায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি।

গত ২ জুলাই একই ধরনের আরেকটি চালান ধরা পড়ে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের দুবাই থেকে আসা একটি ফ্লাইটের কার্গো হল থেকে উদ্ধার করা হয় ১৮ কেজি ৭২০ গ্রাম স্বর্ণ। যার বাজারমূল্য প্রায় ৪৫ কোটি টাকা। এ ঘটনায়ও মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে মামলায় কারও নাম উল্লেখ করে আসামি করা হয়নি।

সর্বশেষ গত ১৯ জুলাই কার্গো ভিলেজে ফলের ক্যারেটে ১৬ কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়। কৌশল হিসেবে চোরাকারবারীরা ক্যাথে প্যাসিফিক কার্গো বিমান ব্যবহার করে। যে ক্যারেটে স্বর্ণ পাওয়া যায়, সেখানে রামবুটান, চেরি ও অ্যাভোকাডো ছিল। অর্থাৎ হংকং হয়ে ফলের কার্টনের মধ্যে সুকৌশলে স্বর্ণ ভরে শাহজালাল বিমানবন্দরে আনা হয়। কার্গোতে ফলের চালান থাকায় এটি সহজেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে যাবে— এমন ধারণা থেকেই এ কৌশল নেওয়া হয়েছিল। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের আসামি করে মামলা করেছে কাস্টমস। তবে এ মামলার তদন্তেও কোনো অগ্রগতি করতে পারেনি পুলিশ।

তদন্তে অগ্রগতি শূন্য

আলোচিত স্বর্ণ জব্দের তিনটি ঘটনার তদন্তে কোনো কূলকিনারা করতে না পারায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। পরপর তিনটি মামলা হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় তদন্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, প্রথম দুটি ঘটনার মধ্যে অনেক মিল রয়েছে। স্বর্ণের পরিমাণ প্রায় একই, ব্যবহার করা হয়েছে একই এয়ারলাইনস। স্বর্ণ পাচারের জন্য বিমানের যে স্থানগুলো ব্যবহার করা হয়েছে, তাতে এয়ারলাইনসের লোকজনের সম্পৃক্ততার বিষয়টি স্পষ্ট।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলেন, থানায় মামলা হওয়ার পর পুরো বিষয়টি তদন্ত কর্মকর্তার ওপর নির্ভর করে। তিনি সহযোগিতা চাইলে তা দেওয়া সম্ভব। কিন্তু তিনি না চাইলে সহযোগিতা করার সুযোগ থাকে না।

তাদের ভাষ্য, তদন্তকারী কর্মকর্তা এখন পর্যন্ত কেন কোনো অগ্রগতি করতে পারছেন না, সেটি বোধগম্য নয়। এ বিষয়ে তিনিই ভালো বলতে পারবেন।

তারা আরও বলেন, সর্বশেষ ১৬ কেজি স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনায় এজাহারে আসামিদের নাম উল্লেখ রয়েছে। তারপরও ওই মামলায় কোনো অগ্রগতি না হওয়া বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। থানা পুলিশের দৈনন্দিন নানা দায়িত্ব থাকে। তারা না পারলে ডিবি, সিআইডি, পিবিআই কিংবা র‌্যাবের মতো সংস্থা তদন্ত করতে পারে। এসব সংস্থার কাছে আসামি শনাক্ত ও গ্রেফতারের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিও রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের চাঞ্চল্যকর ঘটনার তদন্ত থেমে গেলে চোরাকারবারীরা আরও উৎসাহিত হবে। তাই দ্রুত তদন্ত শেষ করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা উচিত।